সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বিবেকের দংশন ও উন্নয়নশীল বিশ্বের নির্বাচন

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

আমাদের সমাজে ‘বিবেকের দংশন’ বলিয়া একটি কথা চালু রহিয়াছে। এই দংশন অনেক সময় মারাত্মক রূপ লাভ করে। বিবেকবান মানুষ অনেক সময় নিজের অপরাধ স্বীকার করিয়া নিজেই নিজের ফাঁসি দাবি করিয়া বসেন। এমনকি অনেকে আত্মহত্যায়ও প্ররোচিত হন। আমরা জানি, সাধারণ অর্থে দেহের দাবিকে বলা হয় ‘প্রবৃত্তি’ আর আত্মার অপর নাম ‘বিবেক’। আত্মা সর্বদা পরমাত্মার মিলনপ্রত্যাশী। এই কারণে একবার বিবেক যখন জাগ্রত হয়, তখন তাহার দংশনে তিনি ধারণ করিতে পারেন নীলবর্ণ। তবে শত অন্যায়-অনিয়ম করিয়াও অন্তরে মরীচিকা পড়িয়া যাওয়ার কারণে অনেকে এই বিবেকের দংশন তেমন একটা উপলব্ধি করিতে পারেন না। তাহা ভিন্ন বিষয়; কিন্তু এক্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যাহা ঘটিয়াছে এবং নির্বাচনোত্তর এখনো যাহা ঘটিয়া চলিয়াছে, তাহাতে কেহ কেহ বিবেকের দংশন হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে পারিতেছেন না। ইহা বড়ই আশাবাদের বিষয়।

এমনই একজন বিবেকবান মানুষ হইলেন সেই দেশের একজন জ্যেষ্ঠ আমলা, যিনি দেশটির ডিভিশন কমিশনারের পদ হইতে পদত্যাগ করিয়া নিজেকে পুলিশের হস্তে সোপর্দ করিয়া দিয়াছেন। তিনি প্রথমে আত্মহত্যা করিতে চাহিয়াছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মহাপাপের মৃত্যুকে বরণ না করিয়া দোষ স্বীকারপূর্বক আত্মসমর্পণকেই শ্রেয় মনে করিয়াছেন। তিনি কিছুদিন পূর্বে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে নিজে যে কারচুপির সহিত জড়িত ছিলেন, তাহা অকপটে স্বীকার করিয়া নিজের এবং ইহার সহিত জড়িত প্রধান বিচারপতি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিচার দাবি করিয়াছেন। তাহার ভাষ্য হইল, তাহার দায়িত্ব পালনকালে ১৩ জন প্রার্থীকে জোর করিয়া বিজয়ী ঘোষণা করা হইয়াছে। ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত প্রার্থীকে জয়ী করা হইয়াছে যেমন, তেমনি ৭০-৮০ হাজার ভোটে আগাইয়া থাকা প্রার্থীদের জালিয়াতির মাধ্যমে হারানোর ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহা পুকুর চুরির ন্যায় বিস্ময়কর ঘটনা হইলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক এমন জোচ্চুরির ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নহে। দুর্ভাগ্য এই সকল দেশের জন্য! জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পরও তাহারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে বারংবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়া চলিতেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার এই সকল দেশের ভাগ্য এই সকল নির্বাচন নামক রাজনৈতিক খেলার কারণে বিপন্ন হইতে আরো বিপন্নতর হইয়া পড়িয়াছে।

ধন্যবাদ সেই ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী আমলাকে, যিনি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির প্রকৃত সমস্যার মুখোশ উন্মোচন করিয়া দিয়াছেন। রাজনীতি, নির্বাচন, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদলই যদি ঠিক না থাকে, তাহা হইলে কীসের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা? ইহাতে অন্য সকল নীতি কীভাবে থাকে সুদৃঢ়? এইভাবে একা হইলেও একটি দেশে অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে হয়। অন্যায়ের সহিত হইতে হয় আপসহীন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেইভাবে নির্বাচন দায়সারা গোছের হইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন। এইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করিয়া লাভ কী? নির্বাচনের পর যেইভাবে দলাদলি ও হানাহানি বাড়ে এবং বাড়ে সামগ্রিক অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা তাহাতে অনেক সময় মনে হইতে পারে যে, নির্বাচন না করাটাই বোধহয় ভালো ছিল। ইহাতে অন্তত রাষ্ট্রীয় অর্থের কিছুটা হইলেও সাশ্রয় হইত। দ্বন্দ্ব-সংঘাত আরো মারাত্মক রূপ ধারণ করিত না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যেই পর্যন্ত না শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী এবং এইরূপ বিবেকবান লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি না পাইবে, সেই পর্যন্ত সেই সকল দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করিবে না। দেশে প্রতিষ্ঠিত হইবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন