সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

টেলিভিশন নাটকে দুরবস্থা: দর্শকের দায় কতখানি

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩০

আশি, নব্বই কিংবা শূন্য দশকে একটি মাত্র টেরিসট্রিয়াল চ্যানেল থাকার কারণে শহরের শৌখিন বনেদি দর্শকের টিভিরুম থেকে শুরু করে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের ভিড় লেগে থাকত মাতবরবাড়ি, মেম্বারবাড়ি, মাস্টার কিংবা দুবাইওয়ালার বাড়ির উঠানে। একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে বাংলাদেশের মধ্যে দেশীয় ৩০টি চ্যানেলের পাশাপাশি বিদেশি অসংখ্য চ্যানেলে দর্শক উপভোগ করতে পারছে। ঐ সময়কার স্বর্ণযুগে যেকোনো নাটক প্রচার হওয়ামাত্রই চারদিকে নাটকের কুশীলব, গল্প নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যেত। বিনোদন ম্যাগাজিনগুলো আরো এক ধাপ এগিয়ে তারকাদের নিয়ে কাভার স্টোরি বা তারকা গসিপ ছাপতেও ভুলত না। এই সময়ে দেশের প্রতিটি চ্যানেল প্রতিদিন একক নাটকসহ ডেইলি সোপ জাতীয় ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার করছে। অথচ শহরের ধনাঢ্য পরিবার থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গ্রামীণ সব শ্রেণির মানুষের টেলিভিশন নাটক উপভোগ তো দূরের কথা, শত পর্ব প্রচারের পরও নাটকের নামই বলতে পারেন না। এমন বাস্তবতা সর্বজন জানা ও লক্ষণীয়।

এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান টেলিভিশন নাটকে এমন দুরবস্থা কেন? এর জন্য নাটকের গল্প, নাকি নির্মাতা, নাকি দর্শক দায়ী? আকাশ সংস্কৃতি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন অবাধ ব্যবহারকালে এ নিয়ে বিস্তারিত মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বৈকি। এটা সত্য যে বাংলা সাহিত্যে নাটকের বয়স ৪০০ থেকে ৫০০ বছর হলেও টেলিভিশন নাটকের বয়স প্রায় ষাট বছরের মতো, যা বাংলাদেশ টেলিভিশনের হাত ধরে উত্থান হয়েছে। একসময় নাটক লিখতেন জাঁদরেল সাংস্কৃতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মঞ্চ ও থিয়েটার কাঁপানো নির্দেশক বা গ্রন্থকারগণ। নাটক লেখা তাদের পেশা না হলেও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, দেশ গঠন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও বিনোদনের চিন্তা করেই নাটক রচনা করতেন।

এখনকার নাট্যকারগণ একগুঁয়েমি গল্প লিখছেন। এক গল্পকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নাটকের ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়ে সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। দর্শক নাটকের শুরু দেখলেই বুঝতে পারেন নাটকের পরিণতি কী হবে! এক বৃদ্ধাশ্রম নিয়েই প্রায় ২০০ নাটক রচনা ও নির্মাণ হয়েছে। নাটক লেখাকে কিছুসংখ্যক লোক পেশা হিসেবে নিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই চর্বিতচর্বণ দিয়ে একই বিষয়কে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নাটক লেখে বলে মৌলিকত্ব বলতে তেমন কিছুই থাকে না। বহু উত্পাদনের গুণে নাটকের স্বাতন্ত্র্য, ভিন্নতা, সাহিত্যদর্শন তেমন কিছুই থাকে না। অন্যদিকে খণ্ডকালীন, শখের বশে যারা নাট্যকার হন, তাদের থেকে প্রকৃত নাটক আশা করাও সমীচীন নয়। ফলে মোটের ওপর যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে সাহিত্যনির্ভর, দর্শক মাতানো নাটক লেখা হচ্ছে না। নাটকের বিষয়বস্তু নিয়েও রয়েছে হাস্যকর অবস্থা। বিদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো নাটকে বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী যুদ্ধ দিয়ে শত শত পর্ব পার করছে। এগুলোতে তেমন মৌলিকত্ব না থাকলেও একধরনের মাদকতা তো রয়েছে, যেটি দর্শকদের টিভি সেটের সামনে বসতে সাহায্য করে। এসব কাহিনি নকল করে কেউ কেউ নাটক নির্মাণের চেষ্টা করছে। এতে খুব একটা দর্শক টানতে না পারলেও বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব তো পড়ছেই, উপরন্তু ভাষা প্রয়োগ ও উচ্চারণের ভুল প্রয়োগও এতে লক্ষ্মণীয়। এটি যুবসমাজের মধ্যেই বেশি।

নাট্য পরিচালকদের মধ্যে নাটকের বাজেট ও মুখ্য শিল্পীদের পারিশ্রমিক নিয়েও নানা রকম রটনা ও তুঘলকি পরিস্থিতি কাজ করছে। টেলিভিশন নাটকে বিজ্ঞাপনের বাজার চ্যানেলের সংখ্যা বাড়ার এবং নাটক ওটিটি ইউটিউবে চলে যাওয়ার কারণে দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে কম বাজেটের চাপে পরিচালকগণ কেবল কথিত সেলিব্রিটি শিল্পী নিয়ে নাটক দিনের মধ্যে নির্মাণ করছেন। এসব নাটকে মা-বাবা নেই, প্রতিবেশী নেই, নেই ভাইবোনও। এসব নাটকও আমাদের মধ্যবিত্ত, দরিদ্র গ্রামীণ ও শহুরে পরিবারগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বিধায় কাঙ্ক্ষিত দর্শক পাওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো পরিচালক সেটেও উপস্থিত থাকেন না, সহকারী পরিচালক দিয়েই শুটিং শেষ করেন। অর্থ ও সময় বাঁচাতে গিয়ে কম্প্রোমাইজ করতে করতে মূল পাণ্ডুলিপি থেকে নাটক অনেক দূরে চলে যায়। নির্মাণ ও সম্পাদনা শেষে মূল নাটকই হারিয়ে যায়। বিজ্ঞাপন এজেন্সি এবং চ্যানেলগুলোর অলিখিত সমঝোতার কারণে নির্দিষ্ট সেলিব্রিটি শিল্পী নিয়েই কাজ করতে হয়। ফলে পুরো শিল্পী বাজার একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এ রকম সিন্ডিকেট করার অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। এতে পরিচালক পাণ্ডুলিপির চাহিদা অনুযায়ী শিল্পী নির্বাচন করতে পারেন না এবং দর্শক একই শিল্পী প্রায় সব নাটকে দেখতে দেখতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এমন কথাও শোনা যায়, নাটকের শিল্পী তার অভিনীত নাটকের নাম জানেন না কিংবা নাটকটির সম্প্রচারও দেখেন না। শিল্পীরা কেবল সময় বিক্রি করে থাকেন এবং পাণ্ডুলিপি পড়া, সংলাপ রপ্ত করা কিংবা রিহার্সেল করা অনেক আগেই ভুলতে বসেছেন।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ঐতিহ্য রক্ষাকারী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো হটিয়ে ওটিটি ও ইউটিউবে জোরেশোরে নাটক আপলোড হচ্ছে এবং এসবে রীতিমতো নাটক বাজার বসেছে এবং দর্শক ফিতে বা বিনে ফিতে নাটক দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে দর্শক টিভি সেটের সামনে না বসেই রান্না করতে করতে, ঘুমাতে ঘুমাতে, সোফায় হেলান দিয়ে, বাসে বসে উপভোগ করতে পারছে জনপ্রিয় কিংবা নতুন যে কোনো নাটক। আয়ের উত্স বিজ্ঞাপন চলে যাচ্ছে ইউটিউব ও ওটিটিতে। যে কারণে টেলিভিশন নাটক দর্শক হারাচ্ছে এবং দিনে দিনে অস্তিত্ব রক্ষার ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনকথা নিয়ে নাটক রচনা ও নির্মাণ করার কথা থাকলেও দর্শক ধরার কৌশল ও চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বিদেশি চ্যানেলগুলোকে নকল করায় লিপ্ত হয়েছে। এতে শাশ্বত বাঙালি পরিবার যেমন অনুপস্থিত, তেমনি এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং গ্রামে, শহরে একক পরিবার বেড়ে যাচ্ছে। বাঙালি পরিবারগুলোর আচার-আচরণে, চলাফেরায়, সংস্কৃতির লালনে বড় রকমের পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে বাঙালি সংস্কৃতি অবশ্যই ঝুঁকিতে পড়েছে। এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, দর্শকদের রুচিমাফিক বা চাহিদা অনুযায়ী চ্যানেল নাটক নির্মাণ করবে, নাকি চ্যানেলে সম্প্রচারিত নাটকই দর্শকরুচির বিনির্মাণ করবে? এই প্রশ্নেরও সুরাহা হওয়া দরকার।

সেকালে কেবল নাটকের কনটেন্ট নয়, অভিনয় প্রতিভা ও নির্মাণশৈলীর গুণে শুধু বাংলাদেশের দর্শকই নয়, প্রতিবেশী ভারত-মিয়ানমারের দর্শকও বাঁশের খুঁটিতে থালা লাগিয়ে বিটিভির সাপ্তাহিক ও ধারাবাহিক নাটক উপভোগ করত। এখনো কানে ভেসে আসে ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘আজ রবিবার’, ‘সংশপ্তক’, ‘পাথর সময়’, ‘সকাল সন্ধ্যা’ প্রভৃতি নাটকের সংলাপ। শুধু তাই নয়, বিটিভি নির্মিত বিশ্বনাটক দেশি-বিদেশে নাটকপ্রেমিদের মধ্যে নাটকবিষয়ক জ্ঞানচর্চা ও বিনোদনের খোরাক জোগাত।

বলা হয় যে, নাটক নির্মাণের পরিমাণ শিল্পবিবেচ্য নয়, বরং স্বল্প পরিমাণের মাননির্ভর নাটকই শিল্পবিবেচ্য। টেলিভিশন নাটকের দর্শক কেন হারিয়ে গেল, কেন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তা আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, গবেষণার প্রয়োজন নেই। টেলিভিশন নাটকে শিল্পচর্চার অভাব, পেশাদার নাট্যকারের স্বল্পতা, চ্যানেলগুলোর বাণিজ্যিক বোধ, দক্ষ অভিনয়জ্ঞানসম্পন্ন নাট্যশিল্পী সৃষ্টি না হওয়া, চ্যানেলগুলোর কথিত সিন্ডিকেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনোদনের খোঁজে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া প্রভৃতি টেলিভিশন নাটকে দর্শক নিম্নগামিতার কারণ বলে ভাবা হচ্ছে।

লেখক: সাহিত্যিক ও বিশ্ব নাটক নির্মাতা

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন