সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী’

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

মাতৃভাষা চিরকালই যে কোনো জনগোষ্ঠীর সবচাইতে স্পর্শকাতর বিষয়। মা, মাটি কিংবা মাতৃভাষার উপর আঘাত কোনো জাতিই সহজে মানিয়া লইতে পারে না। দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করিয়া সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানে প্রথম আঘাত আসে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের ওপর। আসলে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রুদ্ধ করিবার ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিজ পায়ে প্রথম কুঠারাঘাত। এমনকি তাহারা চাহিয়াছিল, বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে রোমান বা আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রবর্তন করিতে। শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের নিকটই নহে, প্রত্যেক মানুষের নিকট তাহার মাতৃভাষা সবচাইতে সুমধুর। পৃথিবীতে মোট ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু ইহার মধ্যে প্রায় ৩ হাজারের মতো ভাষা পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে মাত্র এক শত বত্সরের মধ্যে। ইতিপূর্বে এমন আশঙ্কার কথাই জানাইয়াছেন বিশ্বের ভাষাতত্ত্ববিদরা। যদিও অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পৃথিবীতে নূতন বিপ্লব আনিতেছে। সেই বিপ্লবের ছোঁয়া সকল ভাষার মধ্যেও লাগিতেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে একটি ভাষা হইতে অন্য ভাষায় রূপান্তরের বিষয়টিও অদূর ভবিষ্যতে সহজ ও গ্রহণযোগ্য হইয়া উঠিবে।

বাংলা এখন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ৩৩ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ইহার মধ্যে বাংলাদেশে ১৭ কোটি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে ১৩ কোটি এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে আরো প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাংলা কথা বলে। সবচাইতে আনন্দের কথা হইল, ২০১০ সালে ইউনেসকোর একদল ভাষাবিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণার পর পৃথিবীর সবচাইতে শ্রুতিমধুর ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পাইয়াছে বাংলা ভাষা। সেই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রহিয়াছে যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষা। অথচ এই অপূর্ব শ্রুতিমধুর ভাষাকেই কিনা গলা টিপিয়া ধরিয়াছিল পাকিস্তানি দুঃশাসকেরা। সত্যিকার অর্থে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাকে রক্ষার আন্দোলনই শেষাবধি বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়, ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কোনো ভাষাকে রক্ষার জন্য বাংলা এখন একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত, একুশে ফেব্রুয়ারি হইয়াছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাকে ভালোবাসিয়াই এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে আমাদের বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করিতে হইবে। শিখিতে হইবে ইংরেজিসহ আরো যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।

একুশ আমাদের শুধু ঐক্যবদ্ধই করে নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হইতেও শিখাইয়াছে। একুশের আর একটি বড় শিক্ষা হইল, জনগণের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ কখনোই বিফলে যায় না। একুশ এখন প্রতিবাদের ভাষার প্রতিরূপ। কিন্তু প্রতিবাদ করা এখন তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশেই সহজ নহে। আমরা নিজেরাই নিজেদের চুপ রাখিতেছি। রিজেন্ট হানিইটার পাখির মতো পালন করিতেছি নীরবতা। রিজেন্ট হানিইটার ছিল অস্ট্রেলিয়ার গায়ক পাখি। ইতিপূর্বে জানা গিয়াছে, রিজেন্ট হানিইটার পাখি একসময় দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল সংখ্যায় বসবাস করিলেও এখন মাত্র কয়েক শত বাঁচিয়া রহিয়াছে। তাহারা এখন পুরাপুরি নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবার প্রহর গুনিতেছে। তাহা হইলে সমীকরণটি এইরকম দাঁড়াইল যে, কেহ যখন কথা বলিতে ভুলিয়া যায়, তখন তাহারা বিপন্ন হইয়া পড়ে? কিংবা বলা যায়, বিপন্ন হইয়া পড়িলে কি কথা বলা ভুলিয়া যাইতে হয়? রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছেন—‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি,/ হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী।’ তাই তো; পাখি গান বন্ধ করিলে রাখাল তো বেণু বাজাইতেই পারে। কিন্তু এই বেণু বাজাইবার মতো রাখালও তো থাকিতে হইবে।

এখন কোথায় সেই রাখাল? কোথায় রিজেন্ট হানিইটারের অপূর্ব গায়কি কুজন? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে রাখালরা যেন শীতঘুমে চলিয়া গিয়াছে। রিজেন্ট হানিইটাররা ভুলিয়া যাইতেছে কুজন করিতে। তবে আমাদের ভরসা একুশ। একুশ আমাদের শিখাইয়া গিয়াছে প্রতিবাদের ভাষা। এই গৌরব যাহারা আমাদের দান করিয়াছেন জীবনের বিনিময়ে, একুশে ফেব্রুয়ারির আজিকার দিনে তাহাদের জানাই সালাম-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন