মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩০

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তত্সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ অন্যদিকে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমুদ্দুন মজলিস’ ভাষার প্রশ্নে সোচ্চার হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটি ছাত্র-শিক্ষক মহলে বাংলা ভাষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা-বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করে।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪ জন ভাষাবীর প্রথম ভাষা-আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবি সংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেন। এসব দাবির মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারটি ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল’ নামে একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এ ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন এটাতে অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। অন্যদিকে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির অন্যতম ছিল, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করা হোক।

ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পালিত ধর্মঘটটি ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সফল ধর্মঘট। এই ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। স্বাধীন পাকিস্তানে এটিই বঙ্গবন্ধুর প্রথম গ্রেফতার। আন্দোলন সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়লে অবস্থা বেগতিক দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন আপসের মাধ্যমে আট দফা সমঝোতা চুক্তি করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বঙ্গবন্ধুসহ ভাষা আন্দোলনের অধিকাংশ নেতা কারারুদ্ধ ছিলেন। শর্তানুসারে কারাগার থেকে ১৫ মার্চ নেতারা মুক্তি পেলেন। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ছাত্র-জনতার সভা অনুষ্ঠিত হলো। সভার সভাপতি সদ্য কারামুক্ত মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত মাস পর ১৯ মার্চ গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। ২ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিব বলেছেন, “আমরা প্রায় চার-পাঁচশত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সে সভায়। অনেকে হাত তুলে জানিয়ে দিল মানি না, মানি না। ২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে বক্তৃতা করতে উঠে তিনি যখন আবার বললেন, ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’ তখন ছাত্ররা তার সামনেই বসে চিত্কার করে বলল, ‘না, না, না’। জিন্নাহ প্রায় পাঁচ মিনিট চুপ করেছিলেন, তারপর পুনরায় বক্তৃতা করেন। আমার মনে হয়, এই প্রথম তার মুখের উপরে তার কথার প্রতিবাদ করল বাংলার ছাত্ররা। এরপর জিন্নাহ যতদিন বেঁচেছিলেন, আর কোনো দিন বলেননি, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” শাসকশক্তি ভাষা প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালে প্রবল ছিল না। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সারা দেশে এর প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বন্দি ছিলেন। ৩১ ডিসেম্বর শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় এবং একটানা ২৬ মাস তাকে রাজনৈতিক (নিরাপত্তা) বন্দি হিসেবে জেলে আটক রাখা হয়। বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছাত্রদের সঙ্গে সব সময় তার যোগাযোগ ছিল। জেলে থেকেই তিনি তার অনুসারী ছাত্র নেতাদের গোপনে দিকনির্দেশনা দিতেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন এবং একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে ছাত্রনেতাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তিনি আরো জানিয়েছিলেন যে, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন। সে কারণে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। তবে তিনি অনশন ধর্মঘটের প্রতিশ্রুতি ঠিকই রেখেছিলেন। সেই মতো তিনি এবং মহিউদ্দিন ফরিদপুর জেলে অনশন শুরু করেছিলেন।

বায়ান্নর  ভাষা-আন্দোলন সম্পন্ন হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মাধ্যমে ২১ ও ২২ তারিখে। পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই রফিকউদ্দিন, আবদুল জব্বার শহিদ হন।  ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো ১৭ জন আহত হন। রাতে আবুল বরকত মারা যান। অনশনরত শেখ মুজিবুর রহমান আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুত্ফুর রহমান তাকে নিয়ে যেতে জেলগেটে আসেন। ভাষাবীর বাঙালি জাতির বাতিঘর শেখ মুজিব একটি রাজনৈতিক সত্তা, যার মননে ও চিত্তে বাঙালি ।

লেখক: প্রভাষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলতুন্নেছা

মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন