মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বিশ্ব জলবায়ু ও রাজনীতিতে তাণ্ডব!

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক বৃৃদ্ধি পাওয়ার দশম বত্সর ছিল ২০২৩ সাল। ২০২২ সালের চাইতে অধিক গরম পড়িয়াছিল গত বছরটিতে। তবে উষ্ণ আবহাওয়া পিছু ছাড়ে নাই চলতি বত্সরেও। বরং আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ইতিমধ্যে বলা হইয়াছে যে, উষ্ণতম বত্সর হিসাবে পূর্বের সকল রেকর্ড ভাঙিয়া দিবে ২০২৪ সাল। তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রিতে উঠিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন আবহাওয়াবিদরা। উল্লেখ্য, ১৮৫০ সাল হইতে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর ২০১৬ সাল ছিল সর্বাপেক্ষা উষ্ণতম বত্সর। ঐ সময় বলা হইয়াছিল, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িবার কারণ হইতেছে ‘এল নিনো’। ইহার প্রভাবে কমিতেছে বৃষ্টিপাত, বাড়িতেছে দাবদাহ। আমরা জানি, শিল্পবিপ্লবের পূর্বের সময়ের তুলনায় বর্তমানে পৃথিবী প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হইয়াছে। এই সময়কালে প্রচুর পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারের ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারী গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়াইয়া পড়ে। ইহার কারণেই মূলত বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের স্তর ঘন হইতেছে এবং স্থল ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাড়িতেছে ক্রমবর্ধমান হারে। এইরূপ পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, বিশ্ব এল নিনো পর্যায়ে প্রবেশ করিবার ফলে শুষ্ক আবহাওয়া আরো কয়েক বত্সর অব্যাহত থাকিবে।

এদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সহিত পাল্লা দিয়া উত্তপ্ত হইতেছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনও। সমকালীন বিশ্বরাজনীতিকে আগুনভর্তি কড়াইয়ের সহিত তুলনা করিলে ভুল হইবে না। ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধবিগ্রহের কবলে পড়িয়া বিশ্ব যেন হইয়া উঠিয়াছে অগ্নিগর্ভ। দেশে দেশে ক্রমবর্ধিষ্ণু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যবস্থায় সমস্যা ও সংকট কেবল বাড়িতেছেই। পারস্পরিক রেষারেষি ও দাঙ্গাহাঙ্গামার মুখে পড়িয়া বিশ্বরাজনীতিতে ঘোলাটে পরিবেশ বিরাজমান। বস্তুত, ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটিতে না কাটিতেই হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর ফলে ভূরাজনীতিতে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ চরম আকার ধারণ করিতেছে।

২০২৪ সাল বাস্তবিক অর্থেই একটি নজিরবিহীন বত্সর। বিশ্বের গণতন্ত্রের ইতিহাসেও এই বত্সর হাজির হইয়াছে টুইস্ট লইয়া! কারণ, এই বত্সরে বিশ্বের যত দেশে জাতীয় স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে, তাহা পূর্বে কখনই হয় নাই। বিশ্বব্যাপী অন্তত ৬৪টি দেশ এবং ইহার পাশাপাশি সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভোট হওয়ার কথা চলতি বত্সর। অর্থাত্, বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ বা অর্ধেকই এই বত্সর ভোটে অংশগ্রহণ করিবেন। নির্বাচনের সময় সকল ক্ষেত্রেই একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ঘিরিয়া ধরে চারিপাশ। এই অর্থে, আগামী দিনগুলিতে আন্তর্জাতিক পরিসর জুড়িয়া গরম বাতাসই বহিয়া যাইতে দেখিব আমরা।

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে নানা নাটকীয়তা ও সমীকরণে শেষ হয় গত শতাব্দী। দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অর্ধশত বত্সর ধরিয়া চলা দুই বিবদমান পরাশক্তির মধ্যে কথিত শীতল যুদ্ধের রেষ ছিল শতাব্দী জুড়িয়া। ইহার পর আঞ্চলিক সংগঠনের উপর গুরুত্বারোপ করিয়া বিশ্বশান্তি ও সমতা তৈরির প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়িবার মতো। তবে একবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে নাইন-ইলেভেন হামলা এবং স্যামুয়েল হান্টিংটনের ক্লাস অব সিভিলাইজেশন তত্ত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিবিধি আমূল পালটাইয়া দেয়। দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হানাহানি আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরিয়া ধরে বিশ্বব্যবস্থাকে। এই শতাব্দীর যুদ্ধ-সংঘাতের লাগামহীন প্রবণতা প্রত্যক্ষ করিয়া বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নূতন বিশ্বব্যবস্থা বা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের যাত্রা শুরু হইবে। এমনকি নব্য ব্যবস্থার মধ্য দিয়া বিশ্ব আগাইয়া যাইতেছে বলিয়াও মনে করিতেছেন অনেকে। ইহা এমন এক বিশ্ব, যেইখানে দ্বিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় সকল ধরনের সম্পর্কই স্বার্থের আগুনে পুড়িয়া কেবল উষ্ণই হইয়া উঠিতেছে। বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বে উল্লম্ফন ঘটিতেছে নানাবিধ সমস্যার। ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে পড়িয়া এই সকল দেশ যুদ্ধ না করিয়াও জড়াইয়া পড়িতেছে যুদ্ধের ঘেরাটোপে। কিছু ক্ষেত্রে যেন ‘ভূমি তোমার, সরকার ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ আমার’ অবস্থা বিরাজমান! উন্নয়নশীল বিশ্ব তো বটেই, অনেক উন্নত দেশও সংগ্রাম করিতেছে অবস্থার উত্তরণে। তবে একদিকে জলবায়ুর তাণ্ডব এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—এই দুইয়ের প্রকোপে বিশ্বের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়া দাঁড়াইবে, তাহাই দুশ্চিন্তার বিষয়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন