সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

খেলাপি ঋণের মাত্রা সহনীয় করা প্রয়োজন

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

দেশের ব্যাংকিং সেক্টর নানা জটিল সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। এই সমস্যাগুলো হঠাত্ করে বা তাত্ক্ষণিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। বরং বছরের পর বছর সমস্যাগুলো শুধু বেড়েই চলেছে। নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বর কোয়ার্টারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এটা ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর ২০২৩ সালের জুন কোয়ার্টারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এটা ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ এবং এযাবত্কালের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ খেলাপি ঋণ। অবশ্য খেলাপি ঋণের এই পরিসংখ্যান বাস্তবসম্মত নয়। কারণ পুনঃ তপশিলিকৃৃত ঋণ, অবলোপণকৃত ঋণ এবং মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণের হিসাব যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। কারো কারো মতে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ পৌনে ৪ লাখ কোটি টাকার মতো হবে। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিতর্কে না গিয়েও আমরা বলতে পারি—বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ প্রদর্শন করছে, বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের কোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরই সম্পূর্ণরূপে খেলাপি ঋণ মুক্ত নয়। তবে খেলাপি ঋণের একটি সহনীয় মাত্রা থাকে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ সেই গ্রহণযোগ্য মাত্রা অনেক আগেই অতিক্রম করে গেছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ২ থেকে ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ সহনীয় বলে মনে করা হয়।

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে ঋণ খেলাপিদের নানা ধরনের ছাড় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো জটিল হয়ে উঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে কীভাবে খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি থেকে রক্ষা করা যায়। আরো পরিষ্কারভাবে বললে বলতে হয়, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা কার্যকর বলে বিবেচিত হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, খেলাপি ঋণের সমস্যা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। কাজেই খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকিং সেক্টরকে মুক্ত করতে হলে একটি মাত্র ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হবে না। এজন্য অনেক ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য যেখানে যেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, আমাদের তা করতে হবে। এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে, যাতে ঋণখেলাপিদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে তা পরিশোধ করতেই হবে।

দ্বিতীয়ত, যারা ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানা স্থাপন করেছেন এবং দেশেই বসবাস করছেন, তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায়ের সম্ভাবনা থাকে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো ঋণ হিসাব পুনঃ তপশিলিকরণ করা হলে সেই ঋণ হিসাবকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত বা আখ্যায়িত করা যায় না। তৃতীয়ত, কোর্ট সিস্টেমকে আধুনিকায়ন ও সময়োপযোগী করতে হবে। আমেরিকা বা অন্যান্য উন্নত দেশের উচ্চ আদালত আর্থিক বিষয় ডিল করে না। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমাদের দেশে যে কোনো সামান্য বিষয় নিয়েও উচ্চ আদালতে যাওয়া যায়। এতে উচ্চ আদালতে মামলার জট বেঁধে যাচ্ছে। মামলার ভারে উচ্চ আদালতের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

চতুর্থত, একটি বিষয় ভালোভাবে যাচাই করে দেখা দরকার, তা হলো—যেসব ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে আছে, তার পেছনে কারা ছিলেন। ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের সময় যদি কেউ অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তাকে বা তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘এক হাতে তালি বাজে না।’ শুধু ঋণগ্রহীতাদের কারণেই খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয় না। ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের সময় যদি সঠিকভাবে তা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা না হয়, তাহলে সেই ঋণ হিসাব পরবর্তী সময়ে খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করার একটি উদ্যোগ গ্রহণের কথা শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগের ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী নই। কারণ কে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আর কে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি নন—তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন কাজ। তবে কোর্টে প্রমাণ করতে হবে, যিনি ঋণখেলাপি. তার ঋণের কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য আছে কি না। যদি প্রতীয়মান হয় যে ঋণগ্রহীতার ঋণের অর্থ পরিশোধের মতো সামর্থ্য আছে, তাহলে তাকে ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে।

আমি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপিঋণের হার খুবই সামান্য। প্রদত্ত ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হলে ঋণদানকালেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যদি সতর্কতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। আমি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডেও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছি উপযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দানের জন্য। আমরা পরিচালনা বোর্ড থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দানের জন্য ম্যানেজমেন্টের ওপর চাপ দিইনি। ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট তাদের বিবেচনা অনুযায়ী ঋণ প্রস্তাব বোর্ডে নিয়ে আসতেন। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড যদি সর্বাত্মক সতর্কতামূলক অবস্থানে থাকে, তাহলে বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে কোনো ঋণ প্রস্তাব পাশ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ বড় অঙ্কের প্রতিটি ঋণ প্রস্তাব পরিচালনা বোর্ডের মাধ্যমেই অনুমোদিত হয়। পরিচালনা বোর্ড যদি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টও সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বাধ্য হবে। আমি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে পুরো পরিচালনা বোর্ড অত্যন্ত সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। আমাদের সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকে বড় কোনো ঋণখেলাপির ঘটনা ঘটেনি।

আগে নিয়ম ছিল কোনো শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে সেই শিল্পগোষ্ঠীর কোনো শিল্পকেই নতুন করে ঋণ দেওয়া হতো না। কিছু দিন আগে এই বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন কোনো শিল্পগোষ্ঠীর একটি শিল্প ঋণখেলাপি হয়ে পড়লেও অন্য শিল্পের নামে ঋণ গ্রহণ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং আইনে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। যেসব আইনি পরিবর্তন করা হয়েছে, তা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশোধনের মাধ্যমে আইনগুলোকে যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা যেতে পারে, যাতে এসব আইন প্রয়োগ করে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের মাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন