একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নয় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীদের কেউই ভোট পাননি। এছাড়াও সহস্রাধিক ভোটকেন্দ্রে এক বা দুইটি করে ভোট পেয়েছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে— ৯২৯টি কেন্দ্রে কোনো ভোটার বিএনপিকে ভোট দেননি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইটে সম্প্রতি এ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক যে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে তা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব মো. আলমগীর ইত্তেফাককে বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে যে ফলাফল পাওয়া গেছে তা কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে ইসির কোনো করণীয় নেই।
যদিও গত রবিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা জানিয়েছিলেন, কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক ঘটনা বলে আমার মনে হয় না। তবে এ বিষয়ে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের করণীয় কিছু নেই। ভোটের পরপরই ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ হয়ে যায়। গেজেট প্রকাশের পর ইসির কিছু করার থাকে না। তাই খতিয়ে দেখার সুযোগও নাই।
৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ২৮২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। ৮টি আসনে জয়লাভ করে জোটটি। এর মধ্যে ১০৮টি আসনের ৯২৯টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা একটি ভোটও পায়নি। তবে সিইসির নিজ জেলা পটুয়াখালীর ৪টি আসনের সবকেন্দ্রে ভোট পেয়েছে বিএনপির প্রার্থীরা। এছাড়াও ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে বিএনপির প্রার্থী ছিল। ঐ ১৮টি আসনের সব কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ধানের শীষে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০৩টি নির্বাচনী আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ১৪টি আসনের সব কেন্দ্রেই ৯০ থেকে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভোট পড়ে। ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১২৭টি কেন্দ্রে। অন্যদিকে ১০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে ১১টি কেন্দ্রে।
কোনো কেন্দ্রে ভোট না পাওয়া আসন: গোপালগঞ্জ-১ আসনের ১৩৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৫টিতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এফ ই শরফুজ্জামান কোনো ভোট পাননি। গোপালগঞ্জ-২ আসনে ১৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৬ কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোট পড়েনি। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের ১০৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৯ কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট শূন্য। মাদারীপুর-১ আসনের ৪৭ কেন্দ্রে, মাদারীপুর-২ আসনের ৩৫ কেন্দ্রে, মাদারীপুর-৩ আসনের ৪০ কেন্দ্রে, শরীয়তপুর-১ আসনে ২০ কেন্দ্র্রে, শরীয়তপুর-২ আসনে ২০ কেন্দ্রে, শরীয়তপুর-৩ আসনে ১ কেন্দ্রে, রাজবাড়ী-২ আসনের ২৯ কেন্দ্রে, ফরিদপুর-১ আসনের ৩১ কেন্দ্রে, ফরিদপুর-২ আসনে ৪ কেন্দ্রে, ফরিদপুর-৩ আসনে ৩ কেন্দ্রে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের ৫০ কেন্দ্রে, কুমিল্লা-১১ আসনের ৩০ কেন্দ্রে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনের ৮৫ কেন্দ্রে, লালমনিরহাট-১ আসনের ২৪ কেন্দ্রে, নড়াইল-২ আসনের ১৯ কেন্দ্রে, সাতক্ষীরা-১ আসনে ১০ কেন্দ্রে, বাগেরহাট-১ আসনে ১২ এবং বাগেরহাট-২ ও ৪ আসনে ১৩টি করে কেন্দ্রে, বরিশাল-১ আসনে ২৬ কেন্দ্রে, পিরোজপুর-১ আসনে ১২ কেন্দ্রে, ঝালকাঠি-২ আসনে ৮ কেন্দ্রে, ভোলা-৩ আসনে ৪ কেন্দ্রে, শেরপুর-১ আসনে ১৮ কেন্দ্রে, জামালপুর-৩ আসনে ১৭ কেন্দ্রে, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে ১০ কেন্দ্রে, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ৭ কেন্দ্রে, গাজীপুর-৩ আসনে ৪ কেন্দ্রে, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ৪ কেন্দ্রে, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ৫ কেন্দ্রে, চট্টগ্রাম-১ আসনে ৪ কেন্দ্রে একটি ভোটও পাননি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। এছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট পড়েনি ধানের শীষ প্রতীকে।
গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একদাশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বয়কট করে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। ভোটের পরই স্থানীয়ভাবে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসব ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। জানুয়ারির শুরুতে নির্বাচিতদের নামে গেজেট প্রকাশ করে ইসি। দীর্ঘদিন পর গত সপ্তাহে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ইসির ওয়েবসাইটে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল কেন্দ্র, মোট ভোটার, প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট, বৈধ ভোট, বাতিল ভোট, প্রদত্ত ভোট, শতকরা হার দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে।
৩০০ আসনের ৪০ হাজার ১৫৫ কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিলেন ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১টি। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে বৈধ ভোট ৮ কোটি ২৬ লাখ ৪৫ হাজার ২২১ ভোট। আর বাতিল হয়েছে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬৯০ ভোট। নির্বাচনে ৪১ হাজারের বেশি কেন্দ্রের মধ্যে শতভাগ ভোট পড়া কেন্দ্রের মোট ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১২১ ভোটের মধ্যে বৈধ ভোট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ২৫৭টি। বাকি ৮২ হাজার ৮৬৪টি ভোট ছিল অবৈধ।
