বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

লজ্জা যেন উঠিয়া গিয়াছে!

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘লজ্জা’ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন, ‘আমার হূদয় প্রাণ/ সকলই করেছি দান,/ কেবল শরমখানি রেখেছি।/ চাহিয়া নিজের পানে/ নিশিদিন সাবধানে/ সযতনে আপনারে ঢেকেছি।’ তিনি নিশ্চয়ই বিংশ শতাব্দীর কথা বলিতেছেন। তখনো ‘লজ্জা’ বলিয়া কিছু ছিল; কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে আমরা দিনদিন বেহায়া ও নির্লজ্জ হইয়া পড়িতেছি। কথায় বলে :লজ্জা নারীর ভূষণ; কিন্তু এই কথা তো বলা হয় নাই যে, লজ্জা মানুষের ভূষণ। তাই সামগ্রিকভাবে আজ লজ্জা-শরমে ক্রমান্বয়ে দেখা দিতেছে ঘাটতি ও দৈন্য।

সার্বিকভাবে বিশ্বপরিস্থিতি দেখিয়াও আমাদের প্রতীয়মান হইতেছে, এই পৃথিবী হইতে দিনদিন উঠিয়া যাইতেছে পরম কাঙ্ক্ষিত লজ্জা ও শরম। ইউক্রেন যুদ্ধের দুই বত্সর পূর্তি হইবে আগামীকাল। এই যুদ্ধ বন্ধে লুকোচুরি খেলা দেখিয়া যে কেহ বিস্মিত না হইয়া পারেন না। বিশ্বমোড়লদের লজ্জা থাকিলে এই যুদ্ধ কবে বন্ধ হইয়া যাইত! আপাতত গাজা যুদ্ধ বন্ধেরও কোনো লক্ষণ নাই। এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই যুদ্ধ বন্ধে আলজেরিয়ার প্রস্তাবে ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের ১৩ সদস্যই তাহার পক্ষে ভোট দিলেন; কিন্তু দুই প্রভাবশালী সদস্যের বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগও মাঠে মারা গেল। তাহাদের ভাষ্য হইল, তাহারা যুদ্ধ একেবারে বন্ধ নহে, বরং সাময়িক বন্ধের পক্ষে! অথচ এই পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে যাহারা মারা গিয়াছেন তাহাদের বড় অংশ নারী ও শিশু। তাহার পরও বিশ্বনেতাদের টনক নড়িতেছে না, জাগ্রত হইতেছে না বিবেক। কোথাও কোথাও মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষা করিবার কথা কেবলই বুলিতে পরিণত হইয়াছে। এই সকল ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন এই সংস্থার অপর নাম হইয়া দাঁড়াইয়াছে ঠুঁটো জগন্নাথ। এইখানে কোনো বিহিত হইবার সম্ভাবনা শূন্য বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। ২০০৩ সালে যখন ইরাক আক্রমণ করা হয়, তখন জাতিসংঘকে বাইপাস করিয়াই হামলা চালানো হয়। তাই পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধে এই সংস্থা এখনো তেমন কিছু করিতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোক্ষমতার জোরে কিছু দেশ ধরাকে সরা জ্ঞান করিয়া চলিয়াছে। আসলে এখানেও কাজ করিতেছে লজ্জাহীনতা।

বর্তমানে পৃথিবীতে লজ্জার ঘাটতি দুঃখজনক। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের কথা বলিতে গেলে আমাদের আরো লজ্জা পাইতে হয়। এই রকম বিভিন্ন দেশে একের পর এক যেই সকল নাটক মঞ্চস্থ হইতেছে, তাহা দেখিয়াও আমরা বলিতে পারি—এই সকল দেশের অধিকাংশ নেতার লজ্জা বলিয়া কিছু নাই। যেইভাবে নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় লওয়া হইতেছে, তাহাতে লজ্জায় মুখ লুকাইবার জায়গা কোথায়? সাধারণ মানুষ জানে আসলে তাহারা ভোট দেন নাই; কিন্তু তথাকথিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দিব্যি বুক ফুলাইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন! মাস্তান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমনকি কোনো কোনো দেশে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করিয়া তাহারা পার হইতেছে নির্বাচনি বৈতরণি। কেহ কেহ যেখানে ৫০-৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়া যাইবার কথা, সেখানে তাহারা তাহারও অধিক ভোট পাইয়া জিতিয়া যাইতেছেন অবলীলাক্রমে! এইভাবে নির্বাচনকে তাহারা ছেলেখেলায় পরিণত করিয়াছেন। সামন্যতম চক্ষুলজ্জা থাকিলে এমনটি হইবার কথা ছিল না। শিশুকালে তাহাদের মাতারা কি তাহাদের চক্ষে কাজল দেন নাই? বাংলায় একটি কথা প্রচলন আছে, এক কান যাহার কাটা, সে হাঁটে রাস্তার পার্শ্ব দিয়া, আর দুই কান যাহার কাটা, সে হাঁটে রাস্তার মাঝখান দিয়া। পৃথিবীরও অবস্থা হইয়াছে তাহাই।

আরো পরিহাসের বিষয় হইল, আজকাল কাহারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হইলে কিংবা ইহা লইয়া দুনিয়াব্যাপী আলোচনা হইলেও এই জন্য তাহাকে লজ্জিত হইতে দেখা যায় না। অথচ পূর্বে দেশ জুড়িয়া এমন আলাপ-আলোচনা চলিবার সময় বিবেকবান মানুষ বৈধ অর্থেও গাড়ি-বাড়ি করিতে বিশেষ লজ্জাবোধ করিতেন। সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা জানেন, পুলিশ, বিভিন্ন এজেন্সি বা সংস্থার জোরে অনেকে নির্বাচিত হইয়াছেন। তাহার পরও যখন বলা হয়, ইহার চাইতে ভালো ইলেকশন বা নির্বাচন আর কখনো হয় নাই, তখনো সেই লজ্জা রাখিবার জায়গা থাকে না।

ইত্তেফাক/এমএএম