টানা বর্ষণে রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড় ধসের আতঙ্ক

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ০১:৩৫

বর্ষাকাল শুরু হয়েছে আরো পক্ষকাল আগে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একপ্রকার বৃষ্টিপাত হীন চলছে বর্ষা কাল। কিন্তু মঙ্গলবার দিবাগত রাত হতে টানা বৃষ্টিতে ফিরে এসেছে বর্ষার রূপ। এতে সমতল এলাকায় আনন্দ বিরাজ করলেও আতঙ্ক-শঙ্কায় সময় অতিবাহিত হচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের তিন ডজন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

অতি রোদে টেম্পার নষ্ট হওয়া ত্রিপলের ছাউনি গলে পানি পড়ছে অধিকাংশ ঘরে। ঝড়ো হাওয়ায় অনেক ক্যাম্পের ঝুপড়ি ঘর উড়িয়ে নেয়ার খবরও পাওয়া গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রোহিঙ্গারা আতঙ্কে রয়েছে।

বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কুতুপালং ডাবল 'ও' ক্যাম্পের ময়নার ঘোনায় পাহাড়ের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। এতে কোন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও আরো   আশঙ্কা করা হচ্ছে  পাহাড় ধসের। বৃষ্টি রোহিঙ্গাদের মাঝে বাড়িয়েছে দুর্ভোগ।

আরও পড়ুন: টাইগারদের পারফরমেন্সে মুগ্ধ ক্রিকেট বিশ্ব

জানা যায়, উখিয়া-টেকনাফের প্রায় ৩৪টি ক্যাম্পে অস্থায়ীভাবে বাস করছে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। যাদের বেশীর ভাগই পাদদেশ থেকে থরে থরে পাহাড়ের টিলায় ঝুপড়ি ঘর করে রয়েছেন। ফলে অতি বর্ষণ হলেই পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়। টানা বর্ষণের কারণে গত দুইদিনে উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ে বাঁশ ও পলিথিনে তৈরি অনেক ঝুপড়ি ঘর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া টানা বৃষ্টিতে কাদা ও পয়ঃনিষ্কাশন এলাকার পানি চলাচলের পথে এসে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা হতে বুধবার রাত ১২ টা ২৪ ঘণ্টায় ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে কক্সাবজারে। চলমান বর্ষা মৌসুমের শুরু হতে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও হাল্কা থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
 
কুতুপালংয়ের ডাবল 'ও' ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা সালামত খান জানায়, মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাস রোহিঙ্গা শিবিরে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। রোদে টেম্পার নষ্ট হওয়া ত্রিপলের চাল থেকে বৃষ্টির পানি পড়ছে। শত শত পরিবার এ দুর্ভোগে পড়েছে। বাতাসে উড়ে গেছে অনেক পরিবারের ঘরের ছাউনি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ময়নার ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। জানমালের কোন ক্ষতি না হলেও আরো ধসের আশঙ্কায় অন্যত্র আশ্রয় খুঁজছেন অনেকে।

নয়াপাড়া ক্যাম্পের পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নেয়া আবদুস সালাম বলেন, ঘরে পানি ঢুকায় পরিবারের সবাইকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। সবাই বলাবলি করছে বৃষ্টি বাড়লে পাহাড় ধসে পড়তে পারে। আমার মতো অনেকে সকাল হলে  অন্যত্র আশ্রয় গাড়ার কথা ভাবছে।
 
বালুখালী ১৯ নং ক্যাম্পের মাঝি কালা মিয়া জানান, পাহাড়ে বৃষ্টি হলে মুহূর্তে তলিয়ে যায় চলাচলের পথ। এসময় ঘর থেকে বের হওয়া সবার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। ভারি বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় ক্যাম্পের মসজিদের মাইকে সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছে।

টেকনাফের শীলবনিয়া শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা ইব্রাহিম জানান, ক্যাম্পের ঘরগুলো নড়বড়ে। তাই হালকা বাতাসেও এসব দুলতে থাকে। এ সময় সবাই আতঙ্কে থাকি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী ও টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হাসান বলেন, যেকোন ধরণের দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি আমরা।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে শিবিরের অনেক ঝুপড়ি ঘরে পানি ঢুকেছে বলে খবর পেয়েছি। ভারী বর্ষণে দুর্ঘটনা এড়াতে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতির রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের অন্যত্র সরানোর চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, দুর্যোগ ক্ষতি এড়াতে আমরা তৎপর রয়েছি।    
 
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট হতে কয়েকদিনে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আবাস গড়ে। নতুন-পুরনোসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা পাহাড় সমতলে ঝুপড়ি তুলে অবস্থান করছেন। যাদের অনেকের বাস অত্যন্ত ঝুঁকিতে।

ইত্তেফাক/এমআরএম