রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় বলিয়াছেন—“শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, ‘মারিয়া করিব খুন।’/ বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।” কবি বুঝাইতে চাহিয়াছেন, কাহারো উপর ‘বাবু’ রাগ দেখাইলে তাহার অধীনস্থ ‘পারিষদ’ আরো শতগুণ রোষপ্রকাশে বাবুকে খুশি করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়েন। শতবর্ষ পূর্বে কবি এমন চিত্র আঁকিয়াছেন। পরিতাপের বিষয় হইল, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতেই এখনো এই চিত্র দেদীপ্যমান।
তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে এমনিতেই জনগণের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার শেষ নাই। তাহাদের শরীরের কোষে কোষে শত শত ক্ষত। সেই সকল ক্ষতের নিরাময় প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষতের একটুখানি উপশমের যথার্থ চেষ্টা দূরের কথা, মূল্যস্ফীতিসহ বিবিধ সংকটের চাপে পড়িয়া বরং সেই সকল ক্ষত আরো গাঢ় হয়। এই অবস্থায় কেহ যদি সেই ক্ষত তথা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়, তাহা হইলে সাধারণ মানুষের মনের অবস্থা কেমন হইতে পারে? মনের ভাব প্রকাশ করিবার জন্য মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বা দিয়াছেন। জিহ্বা এমন একটি অঙ্গ, যাহা দিয়া আমরা অনেক পুণ্য অর্জন করিতে পারি, আবার ইহার খারাপ ব্যবহার আমাদের দুর্ভোগের কারণ হইয়া উঠিতে পারে। দেখা যায়, জিহ্বার দ্বারা আমরা গুনাহের কাজ অধিক করি। এই সমস্যার মূলে রহিয়াছে আমাদের অজ্ঞানতা এবং কালচার। এক বিশিষ্টজন বলিয়াছিলেন—বাঙালির কালচার নাই, যাহা আছে তাহা এগ্রিকালচার। বাঙালির গিবত ও বাজে কথা বলিবার প্রীতি দেখিয়া এক স্কলার আরো আগাইয়া বলিয়াছিলেন, ‘এগ্রিকালচার নামে বাঙালির যাহা আছে, তাহা আসলে আগিল-কালচার।’ আমরা আসলে এই ‘কুিসত কালচার’ হইতে বাহির হইতে পারিতেছি না। জিহ্বার লাগাম টানিয়া ধরিতে পারিতেছি না। অনেকে বলেন, মেধা যদি না থাকে, তাহা হইলে মনন তৈরি হয় না। তৃতীয় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন অনেকেরই মনন তৈরি হয় নাই। এই জন্য অনেকেই তাহার জিহ্বা সংযত না করিয়া মুখে যাহা আসে তাহাই বলিয়া ফেলেন। তখন ভাষার বিষে নীল হইতে হয় সাধারণ মানুষকে। এখন, পারিষদ শ্রেণির কাহারো কাহারো দিশাহীন শূন্যগর্ভ ভাষণের মধ্যে আশা না থাকিয়া বিষ থাকিলে মানুষ কোথায় যাইবে? ১৯৫৭ সালের ২১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় একজন স্বতন্ত্র সদস্য দাঁড়াইয়া তাত্পর্যপূর্ণ কিছু শ্লেষ কথা বলিয়াছিলেন, যাহার মর্মার্থ হইল—ইহারা (দায়িত্বপ্রাপ্তরা) বলিবে দক্ষিণে, কিন্তু উত্তরে যায়;/ সাপের মাথায় ব্যাঙ নাচে,/ জলে শিলা ভাসে, বানর সংগীত গায়।
মনে রাখিতে হইবে, হাদিসে নাজাত পাওয়ার জন্য প্রথমেই জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করিবার কথা বলা হইয়াছে। এই জন্য বলা হয় যে, জিহ্বার কারণে মানুষ ৩০টিরও বেশি গুনাহতে লিপ্ত হইতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার চাইতে ‘জিহ্বা সংযত রাখা’ বেশি কঠিন। এই জন্য রাসুল (সা.) ইরশাদ করিয়াছেন—‘যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস :৭৮৫৪)। সুতরাং বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি বেশি কথা বলিবার পূর্বে ভাবিয়া দেখেন—এই কথাটি তাহার কি না-বলিলেই নহে? হজরত আলি (রা.) বলিয়াছেন যে, যদি শরীরের কোনো অঙ্গে বিষ থাকে তাহা হইল—বাগ্যন্ত্র। (কাওয়ায়েদুন নবওয়্যািহ :২৯৯)। যথার্থ অর্থেই জিহ্বার বিষ এতটাই বিষাক্ত যে উহা অনেক অর্জনই তছনছ করিয়া দিতে সক্ষম। জিহ্বা একই সঙ্গে হিতকর এবং অনিষ্টের মূল। ইহার দ্বারা অন্যকে বন্ধু বানানো যায়, পুণ্য অর্জন করা যায়, মানুষের চোখের জল মুছিয়া দেওয়া যায়। আবার ইহার দ্বারাই অন্যকে প্রবলভাবে ক্ষতবিক্ষত করা যায় এবং পরম শত্রু বানানো যায়। এই জন্য যাহারা বিজ্ঞবান, তাহারা ভাবেন—কী দরকার এত কথা বলিবার? মনে রাখিতে হইবে, সৃষ্টিকর্তা আমাদের একটি মুখ কিন্তু দুইটি কান দিয়াছেন। ইহার মাজেজা হইল—তুমি কম বলো, বেশি করিয়া শোনো। কিন্তু আমরা কতজন তাহা বুঝি বা মানি?
