বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

তারুণ্য, বইমেলা ও আশা-হতাশা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০০

কেমন আছে আমাদের তারুণ্য? যখন আমরা সবাই সামাজিক মিডিয়ায় ব্যস্ত, আমাদের কারো হাতে সময় নেই, তখন তাদের অবস্থা কী? একটা প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, কলাম মানে মাথাভারী সব লেখা। এ প্রক্রিয়া অনেকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন। অনেকে এখনো চালু রেখেছেন। আমি মনে করি, এমন সব বিষয়ে লেখালেখি বেশি হওয়া দরকার, যা আমাদের ভবিষ্যত্-প্রজন্মের জন্য মঙ্গলজনক। এই যে তারুণ্য এখন বইমেলায় ভিড় করে, এটা আশার বিষয়। আমরা এই বয়সে আকুল হয়ে দেখি, কেমন তাদের প্রতিক্রিয়া? কী চায় তারা?

পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধার নয়। এখনকার সমাজের ক্রেজ বা ক্রাশ শব্দগুলির ব্যবহার যেমন বোঝা দায়, তেমনি বোঝা মুশকিল কে কার জন্য কী করে, কেন করে? হঠাত্ করে অসম বয়সি বিয়ের ধুম আর সেসব নিয়ে মাতামাতি হয়ে উঠেছে নতুন বিষয়। একটি মেয়ে বয়সে নবীন। সে কি ভুল করেছে না ভালো করেছে, তা বুঝে উঠতে উঠতে বিয়ে করেছে পরিণত বয়সের মানুষকে? দেশের খ্যাতনামা ও জনপ্রিয় লেখকও তাই করেছে। তখন এসব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাত মাঝবয়সিরা। বয়সিদের কাছে ছিল এগুলো ঘৃণার বিষয়। এখন দেখছি উলটো।

বদলে যাওয়া সমাজের চিত্র বলছে, তরুণ-তরুণীদের একাংশ এ নিয়ে প্রতিবাদ করছে। প্রতিবাদ করাটা খারাপ কিছু নয়। বরং আমাদের দেশ ও সমাজে প্রতিবাদ বিষয়টাই হারিয়ে গেছে প্রায়। অগ্রজ যারা বেঁচে আছেন, তাদের অনেকেই এখন গৃহকোণে। তাদের কোণঠাসা করে রেখেছে সমাজপতিরা। আর যারা গড্ডলিকাপ্রবাহে, তাদের মন মজে আছে পদ-পদকে। কীভাবে তা বাগানো যায়, সে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে তারা। মধ্যবয়সিরা সব বাদ দিয়ে খালি জিন্দাবাদ আর স্তাবকতায় ব্যস্ত। এমন একটা অবরুদ্ধ সমাজে তারুণ্য প্রতিবাদ করছে দেখে ভালো লাগার কথা। কিন্তু তা পারছি কই?

এই প্রতিবাদের ভালোমন্দ নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু প্রতিবাদটা হঠাত্ করে বইমেলায় কেন? এই বইমেলাটি এমনিতেই ক্রেতার সমস্যায় আছে। মানুষ যাচ্ছে বটে, খবর পাই তাদের আগ্রহের তালিকায় চটপটি কফি ফুচকা শীর্ষে; ও আড্ডা। আর আছে দেখা করা। যার আবার আরেক নাম ডেটিং। তা হঠাত্ করে সব প্রতিবাদ বইমেলায় করার কারণ কি মেলাটির শান্তি বিনষ্ট করা? এ লেখা যখন লিখছি, তার এক-দুই দিন আগে এক জন রাজনীতিতে হঠাত্ আসা ব্যক্তিকে ভুয়া ভুয়া ধ্বনি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। হিরো নাম নেওয়া মানুষটি তো বিয়েশাদি করেনি, তার দায় বা সে কেন অভিযুক্ত? নাট্যকার মামুনুর রশীদ যখন তার ব্যাপারে রুচির সংকট বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন যে হাজার হাজার লেখা ও মন্তব্যে তাকে অপমান করা হলো, সে তারুণ্য কোথায়? রাতারাতি বদলে গেছে তাদের মনোভাব? আমি সে মানুষটির সঙ্গে একমত, যিনি আগ বাড়িয়ে লিখেছেন এই অপমান মূলত একটি রিহার্সাল। হয়তো এরা পরের বছর ড. জাফর ইকবালের মতো কাউকে টার্গেট করলেও করতে পারে। ফলে এই প্রতিবাদ যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, তা বলা যাচ্ছে না।

বলছিলাম তারুণ্যের কথা। আমরা তাদের হাতে সঠিক বইপত্র তুলে দিতে পারিনি। টিভি বা অন্য সব মিডিয়ায় সিলেবাসের বইপত্র বিনা পয়সায় দেওয়ার ছবি দেখে আমরা আকুলিত হই। সেটা নিঃসন্দেহে শুভ প্রক্রিয়া। কিন্তু তাদের হাতে আরো অনেক বইপত্র দেওয়ার কথা ছিল, আমরা পারিনি। ভয়াবহ সব বইয়ের খবর দেখি সামাজিক মিডিয়ায়। শিশুদের সেসব বইয়ে ‘গ’তে গান-বাজনা ভালো নয়, এমন কথা লেখা।

এরা বর্ণমালা পরিচয়ের নামে সুকৌশলে বিষ তুলে দিচ্ছে শিশুদের মুখে। আনন্দ ভালো নয়, গান ভালো নয়, এসব বিষয় মাথায় ঢোকানোর অপচেষ্টা নিয়ে সরকারি মহলে কোনো সাড়া আছে বলে মনে হয় না। অথচ এভাবেই আমরা হারিয়েছি প্রচুর অর্জন, যা চিরতরে ছেড়ে গেছে আমাদের।

দেখবেন ইউটিউব জুড়ে তরুণ-তরুণীদের ভয়াবহ সব সংলাপ। এরা ভাষা আন্দোলন জানে না, কবে কখন স্বাধীনতা দিবস, জানে না। ১৬ ডিসেম্বর কেন তাত্পর্যপূর্ণ, জানে না। কী হবে এদের নিয়ে? টক শোতেও এগুলো বিষয় নয়। বিষয় আওয়ামী লীগ-বিএনপি। রাজনীতিতে মৃতপ্রায় বিএনপিকে নিয়ে যে আগ্রহ, তার সিকিভাগও নেই এদের নিয়ে। অথচ বিদেশের মাটিতে বড় হওয়া যে প্রজন্মকে নিয়ে আমরা ভাবতাম, মনে করতাম এদের কী হবে, তারাই বরং এগিয়ে চলেছে। আমাদের সিডনিতে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মের এক তরুণী মুনাসিব। তাকে আমি কথা ফোটার আগে থেকেই চিনি। সে এখন পূর্ণ তারুণ্যে। হাত দিয়েছে চলচ্চিত্রের মতো গভীর বিষয়ে। সিরিয়াস ধরনের কাজ দিয়ে শুরু। ওয়েস্টার্নার নামের এই ছোট্ট ছবিটি তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, জানি না। তবে এই প্রক্রিয়া এর আগেই আমি ঘরে দেখেছি। আমার একমাত্র সন্তান অর্ক এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছে। যে কথাটা বলতে চাই—প্রবাসের প্রজন্মকে আমরা যেন ভুল না বুঝি। তারা দেশ ও দেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ সম্মান তুলে ধরার কাজে ব্যস্ত। অথচ এর ভিত্তিভূমি জন্মভূমির মাটিতে চলছে উলটোযাত্রা। দুই দিন পর যখন ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে যাবে, পুরোনো কাপড়ের মতো জাতি ছুড়ে ফেলবে একুশের চেতনা। আবার নয়া উদ্যমে ইংরেজি বলা, হিন্দি গান শোনা আর বিদেশের প্রেমে মজবে সমাজ। বলে রাখি, কোনো ভাষা জানা বা শেখা বা চর্চা করা অন্যায় নয়। অপরাধও নয়। কিন্তু তা শিখতে হবে, জানতে হবে। কতগুলো শব্দ জেনে তার বিকৃত প্রয়োগে বাহাদুরি নেই। সেটাই চলছে সগৌরবে; এবং ভয়টা সেখানেই।

আমি আশাবাদী মানুষ। এই ফেব্রুয়ারি মাসের অকৃত্রিম এক মহামানুষ আবদুল গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে শেষ কথোপকথনে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, জাতির জন্য তার শেষ কথা কী? তিনি একটু থমকে বলেছিলেন, ‘আবার তোরা বাঙালি হ’। বাঙালি হওয়ার সাধনা সত্তর বছরেও পূর্ণতা পায়নি। উলটো এখন ভয় আর আতঙ্কে আছে জাতি। উন্নয়নের গল্প ও বাস্তবতার সঙ্গে এগুলো মানায় কি-না, তা ভেবে দেখার অনুরোধ কি আদৌ তাদের কানে পৌঁছাবে, গদি যাদের?

ইত্তেফাক/এএইচপি