বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

যুদ্ধ যেন নতুন স্বাভাবিক বিষয়

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

বিশ্বব্যাপী সমস্যা, সংকটের শেষ নেই। অবস্থাদৃষ্টে বেশ ভালোমতোই বোঝা যায়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার যুগে বাস করছি আমরা। বিশ্বব্যবস্থা কঠিন হুমকির সম্মুখীন! সব মিলিয়ে যেন শীতল যুদ্ধের কাল পার করছে পৃথিবী! দুঃখজনক হলেও সত্য, উদ্ভূত নানাবিধ হুমকি ও সংকটকে দেখা হচ্ছে আলাদা আলাদা ইস্যু হিসেবে। তবে মনে রাখা জরুরি, এসব সমস্যা একটি আরেকটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত! অথচ সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদা করে মোকাবিলা করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে এই আশায় যে, খুব শিগিগরই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে।

চারপাশে তাকান। কী দেখতে পাচ্ছেন? কেবল যুদ্ধ আর সংঘাত! ইউক্রেন যুদ্ধের কথাই ধরুন। এই যুদ্ধ খুব বাজেভাবে চলছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কেবল দোষারোপই করে যাচ্ছে। সব থেকে বড় কথা, সংঘাতের ময়দানে উভয় পক্ষই নানান ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম ব্যবহারের দিকে পা বাড়াতে চাইছে।

ইউক্রেনের জন্য বড় সমস্যা, পশ্চিমা পক্ষ থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থের জোগান আটকে গেছে। মার্কিন কংগ্রেস ইউক্রেনকে আর সেভাবে সাহায্য করতে চাইছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিচ্ছে বটে, তবে তাতে কিয়েভের প্রয়োজন মিটবে না বলে জানিয়ে আসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ইউক্রেনীয় বাহিনীর অস্ত্রভান্ডারে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে ইইউয়েরও অবশ্য তেমন কিছু করার নেই। কারণ, ইউরোপের হাতে সম্ভবত সেই পরিমাণে সামরিক সরঞ্জামাদি নেই।

আমরা দেখে আসছি, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাশিয়ার বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এই লড়াই-সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত কতটা আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সম্প্রতি আমার কথা হয়েছে এ বিষয়ে। তিনি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এ নিয়ে। তার ভাষায়, ‘ইউক্রেনীয়দের সাহসী বলতেই হয়। তবে মনে রাখতে হবে, তারা সুপারম্যান নয়। যদি প্রত্যাশামতো অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সক্ষমতায় না থাকে, তাহলে এই যুদ্ধে তারা খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে না।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে আসছেন, ‘শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে রাশিয়া।’ পুতিনের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র সহায়তা নিতে পারে মস্কো। সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারে কিউবার কাছে পর্যন্ত। অন্যদিকে, চীন ও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে আছে বলে ধরে নিতে হবে। এই তালিকায় তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্রও। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এসব রাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়-বাণিজ্য চালিয়ে আসছে অনেকটা অবাধে। এর ফলে স্বভাবতই বেশ উপকৃত হচ্ছেন পুতিন ও তার রাশিয়া।

একটি বিষয় সম্ভবত আমরা ভুলে যাচ্ছি, অন্য ভূখণ্ডে ‘আগ্রাসন’ চালানোর প্রশ্নে রাশিয়া যদি সফল হয়, তাহলে ঘোর বিপত্তি বাধবে বিশ্বব্যবস্থায়। কারণ, এতে করে ‘বহু দিনের আদর্শ’ ভেঙে পড়বে নিশ্চিতভাবে। বলপ্রয়োগ করে সীমানা পরিবর্তন করা যায় না—বিগত ৮০ বছর ধরে এমন আদর্শ ধারণ করে চলেছে বিশ্ব। এই অবস্থায় রাশিয়া সার্বভৌম ইউক্রেনকে কবজা করতে সফল হলে স্বভাবতই ছেদ পড়বে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থায়।

এ তো গেল ইউরোপের ঝামেলা। বড় ধরনের সমস্যা চলছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়েও। অনেকে মনে করেছিলেন, গাজা যুদ্ধ খুব বেশি দূর গড়াবে না। এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সামনেও পতন ভিন্ন পথ খোলা নেই। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের আকস্মিক হামলার পর প্রতিশোধপরায়ণ ইসরাইল গাজা থেকে হামাসকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবিরাম বোমাবর্ষণ, লড়াই-সংঘর্ষ এবং শয়ে শয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি আরো কয়েক মাস চলবে বলেই মনে হচ্ছে। অন্যান্য দেশে যে উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাও আরো বাড়বে এর সূত্র ধরে।

বাস্তবতা হলো, নেতানিয়াহুর গদি যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ইসরাইলি নেতানিয়াহুকে অপছন্দ করতে পারে, কিন্তু তার যুদ্ধের নীতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছেন না। সম্প্রতি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ নিয়ে এক প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে নেসেট, যেখানে বলা হয়, ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে একতরফা নীতিকে সমর্থন করে না ইসরাইল। ভোটাভুটিতে ১২০ ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পড়েছে নেতানিয়াহুর সরকারের পক্ষে। বলা বাহুল্য, নেতানিয়াহুর জোটে সংসদ সদস্য রয়েছেন মাত্র ৬৪ জন। অর্থাত্, অনেক বিরোধী সংসদ সদস্য সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

ভুলে গেলে চলবে না, ইসরাইলি বাহিনীর লড়াই কেবল হামাসের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ নেই। হিজবুল্লাহর সঙ্গেও রীতিমতো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়েছে তেল আবিবের। এক হিসাবে জানা গেছে, দুশোর বেশি হিজবুল্লাহকে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। এমনকি ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাত সামনের দিনগুলোতে আরো প্রকট হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

আইডিএফের মূল লক্ষ্য হলো, হিজবুল্লাহকে এমনভাবে কোণঠাসা ও দুর্বল করে তোলা, যাতে করে উত্তর ইসরাইল থেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা প্রায় ৮০ হাজার ইসরাইলি নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে পারে নির্বিঘ্নে। হিজবুল্লাহ যে সহজে এ কাজ করতে দেবে, তেমনও কিন্তু নয়। বরং হিজবুল্লাহর তরফ থেকে জোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। এর ফলে কী হবে? সংঘাত আছড়ে পড়তে পারে লেবাননের মাটিতে। আর সেক্ষেত্রে লেবাননে প্রবেশ করা ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর মুখোমুখি সংঘর্ষে বৈরুত হয়ে উঠতে পারে যুদ্ধের নতুন ময়দান।

এসব সংঘাত-সংঘর্ষ মাথাচাড়া দেবে বলে যখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, তখন চোখ রাঙাচ্ছে আরেক ইস্যু—‘হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী’। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে সুয়েজ খালে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা কমে গেছে ব্যাপকভাবে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, এই রুটে বাণিজ্যিক কন্টিনিয়ার পরিবহন কমে গেছে প্রায় ৭২ শতাংশ। এমনকি লোহিত সাগর ঘিরে বাণিজ্য সচল-স্বাভাবিক রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সব উদ্যোগ নিয়েছিল, তা-ও তেমন একটা কাজে আসছে না। ফলে এই অঞ্চল জুড়ে হুতিদের দাপট আগামী দিনগুলোতে বাড়বে বই কমবে না।

এক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার, লোহিতসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বা হচ্ছে। এর ফলে আমেরিকার প্রতি মিত্র দেশগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতায় চিড় ধরতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই সমুদ্রে চলাচলের প্রশ্নে অগাধ স্বাধীনতার গ্যারান্টি দিয়ে থাকে। তবে হুতিদের হামলা ঠেকাতে না পারার কারণে সমুদ্রে নিরাপত্তার প্রশ্নে বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আর তাকিয়ে না-ও থাকতে পারে।

সমস্যা আছে আরেক জায়গায়। রাশিয়া ও চীন সমুদ্র্রের তলদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইন্টারনেটের তার কাটার বিষয়ে সক্ষমতা তৈরি করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিতসাগরে সৃষ্ট বিঘ্ন বন্ধ করতে না পারে, তথা হুতিদের থামাতে না পারে, তাহলে বেইজিং ও মস্কো যে কোনো সুযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না নিশ্চয়ই!

ওপরের ঝামেলাগুলো ছাড়াও নানামুখী সমস্যা, সংকট চলছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। মাথায় রাখতে হবে, আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি যেখানে ‘উচ্চ নিরাপত্তা’ ব্যতীত স্বস্তিতে বসবাস করার সুযোগ নেই। ফলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বাভাবকিভাবেই সরকারগুলোকে ব্যয় বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে দক্ষতা।

আজকের বিশ্বে যেভাবে একটার পর একটা নতুন সমস্যা হাজির হতে দেখা যাচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, উঠপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থাকার সময় এটা নয়। বিশ্ব আসলেই বিপজ্জনক সময় পার করছে!

লেখক: নিয়মিত কলামিস্ট ও সিএনএনের ‘ফরিদ জাকারিয়া জিপিএস’ হোস্ট

সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি