বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠান জনগণকেই রক্ষা করিতে হইবে

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গত শনিবার সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি পাকিস্তান আমল হইতে এক দলের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক অবস্থান, রাজনীতিকে ব্যবহার করিয়া একশ্রেণির উঠতি পুঁজিপতির বিপুল সম্পদ অর্জন, স্বজনতোষণনীতি অবলম্বন ইত্যাদি বিবৃত্ত করিবার পাশাপাশি বলিয়াছেন যে, উন্নত দেশে পরিণত হইতে হইলে আমাদের শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে। আমাদের গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করিয়া তুলিবার প্রতি আমরা বরাবরই গুরুত্বারোপ করিয়া আসিতেছি; কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও এই ক্ষেত্রে আমরা কেন ব্যর্থতার পরিচয় দিতেছি এবং এক এক করিয়া অনেক প্রতিষ্ঠান ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে এবং তাহার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হইয়া যাইতেছে, তাহা গভীর চিন্তাভাবনার বিষয় বইকি।

একটি দেশের ইনস্টিটিউটশন বা প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী না হইবার বহু কারণ রহিয়াছে। তবে এই জন্য আমরা সবচাইতে বড় যে কারণকে দায়ী করি, তাহা হইল সাধারণ নাগরিকদের অসচেতনতা। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন হইতে শুরু করিয়া বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠে জনকল্যাণে ও জনচাহিদাকে সম্মুখকে রাখিয়া; কিন্তু জনগণ যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলিয়া ভাবিতে না শিখেন, তাহা হইলে সেই দেশে এইরূপ প্রতিষ্ঠানগুলি রুগ্ণ ও দুর্বল থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। দেখা যাইতেছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে জনগণের বিভিন্ন প্রকার করের টাকায় গড়িয়া উঠিতেছে ও পরিচালিত হইতেছে এই সকল প্রতিষ্ঠান; কিন্তু অশিক্ষা, অসচ্ছলতা ও অসচেতনতার কারণে সাধারণ নাগরিক এই বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন না। এই জন্য এই সকল প্রতিষ্ঠান যখন ক্ষতিগ্রস্ত হইবার কথা বলা হয়, তখনো তাহারা থাকেন নির্লিপ্ত ও উদাসীন। তাহারা এই জন্য তেমন একটা প্রতিবাদ করিবারও প্রয়োজনবোধ করেন না অনেক ক্ষেত্রে। এই সকল প্রতিষ্ঠান হইতে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাইলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশনে যাইতে হইবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বিভাগে অভিযোগ দায়ের করিতে হইবে। এই প্রারম্ভিক ও নাগরিক দায়িত্বটুকুও অনেকে পালন করেন না। অনেকে কেবল জনপ্রতিনিধির নিকট ধরনা দিয়াই বসিয়া থাকেন। অথচ আফ্রিকার মতো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেও আজকাল প্রয়োজনে প্রতিবাদ-প্রতিরোধমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। ইহাতে আমরা আশান্বিত না হইয়া পারি না।

আমাদের দেশের মানুষকেও আমরা প্রতিবাদমুখর হইতে কখনো দেখি নাই তাহা নহে। তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে সকল প্রকার অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন এই দেশের সংগ্রামী জনতা। তাহারা শুধু রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামই করেন নাই, জেল-জুলুম সহ্য করিবার পাশাপাশি আত্মোত্সর্গও করিয়াছেন। আজ শুধু একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দল কথা বলিতেছেন; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে কেবল তাহারা সোচ্চার হইলে চলিবে না, নিজেদের অধিকার কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়া নিতে জনগণকেই মাঠে নামিতে হইবে। যুগের পর যুগ ধরিয়া অন্যায়, অত্যাচার, অবৈধ দখলদারিত্ব, যুদ্ধবিগ্রহ, সীমাহীন ধ্বংসলীলা ইত্যাদি চালাইবার পরও ফিলিস্তিনিরা লড়িয়া যাইতেছেন। নিজের পরিবার-পরিজন হারাইয়াও কখনো মনোবল হারাইতেছেন না। তাহাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন কবে পূরণ হইবে তাহা আমরা জানি না; কিন্তু তাহারা তাহাদের অধিকারের ব্যাপারে সদা জাগ্রত। অনুরূপভাবে অবিরাম সংগ্রাম ও লড়াকু মনোভাব না থাকিলে কোনো জাতি তাহার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে না। নিজেদের প্রতিষ্ঠান গড়িবার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সচেতন না হইলে তাহাদের জন্য গড়িয়া তোলা প্রতিষ্ঠান তাহাদেরই স্বার্থের প্রতিকূলে চলিয়া যাইতে পারে।

যে কোনো প্রতিষ্ঠান এক দিনে গড়িয়া উঠে না। ইহা সময় ও পরিশ্রমসাধ্য; কিন্তু গড়িয়া তোলা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হইতে তেমন সময় লাগে না। তাই গণতন্ত্রের জন্যও আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করিয়া যাইতে হইবে। তাহা না হইলে ইহা ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়। এই পৃথিবীতে গণতন্ত্র টিকিয়া থাকিবে কি না, এই ব্যাপারে সম্প্রতি প্রশ্ন করা হইয়াছিল আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। ইহার জবাবে তিনি চমত্কার মন্তব্য করিয়াছেন যে, গণতন্ত্র আমাদের জন্যই দরকার এবং এই জন্য আমাদেরই সংগঠিত হইতে হইবে। অতএব, জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠান জনগণকেই রক্ষা করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন