সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ঋণ ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ হ্রাস করিতে হইবে

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

ঋণ মানুষের জীবনে নূতন সুযোগ প্রদান করে। আবার এই ঋণই মানুষের জীবনে লইয়া আসে দুর্ভোগ। জীবনে কেহ কখনো ঋণ গ্রহণ করেন নাই—এমন ব্যক্তি এই একবিংশ শতাব্দীতে খুঁজিয়া পাওয়া মুশকিল। আধুনিক জীবনের সহিত ঋণ যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রাচীন ভারতীয় চার্বাক দর্শনে বলা হইত—ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্, যাবত্ জীবেত্ সুখং জীবেত্। অর্থাত্, ঋণ করিয়া হইলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচ সুখে বাঁচ। আধুনিক জীবন যেন এই চার্বাক দর্শনে ডুবিয়া গিয়াছে; কিন্তু ঋণের ঘি সকলের পেটে সহ্য হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার খাপছাড়া কবিতার প্রথম পঙিক্ততে লিখিয়াছেন—‘হাতে কোনো কাজ নেই,/ নওগাঁর তিনকড়ি/ সময় কাটিয়ে দেয়/ ঘরে ঘরে ঋণ করি।’

এইদিকে গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান প্রতিবেদন ছিল সাধারণ মানুষের ঋণ লইয়া। খবের বলা হইয়াছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের মানুষের মানসিক চাপ বাড়িতেছে। বাড়িতেছে ঋণের বোঝা। দ্রব্যমূল্য দিনে দিনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। মূল্যস্ফীতি এখন এমন পর্যায়ে চলিয়া যাইতেছে, যেইখানে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তে পরিণত হইতেছে। মানুষ এখন বাধ্য হইয়া সঞ্চয় ভাঙিয়া খাইতেছে। আর যাহাদের সঞ্চয় নাই, তাহারা ঋণ করিতেছে। ফলে মানুষের মনের উপর চাপ বাড়িতেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চাপ সহিতে না পারিয়া বেশ কয়েকটি পরিবারে সন্তানদের লইয়া আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়াছে। বিশেষ করিয়া, এনজিও বা মহাজনদের নিকট হইতে ঋণ লইয়া নিঃস্ব হইয়াছে বহু পরিবার। সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় সায়মা বেগম (৩৫) তাহার মেয়ে ৯ বত্সরের ছাইমুনা এবং সাত বত্সরের ছেলে তাওহীদকে লইয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তিনি ঋণের চাপে আত্মহত্যা করিয়াছেন। গত বত্সরের সেপ্টেম্বরে ঋণের জ্বালা সহিতে না পারিয়া ঝিনাইদহের ৫৫ বত্সর বয়সি সিরাজুল ইসলাম আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার চিরকুটে তিনি লিখেন—‘সুদখোরদের অত্যাচারে বাঁচতে পারলাম না। আমার জায়গাজমি, বাড়ি—সব বিক্রি করে দিয়েছি। একেকজনের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া, তার সাত-আট-দশ গুণ টাকা দিয়াও রেহাই দিল না তারা। কেউ আবার কেস করেছেন, কেউ অপমান-অপদস্থ করেছেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না, তাই বিদায় নিলাম।’ ইহার পূর্বে গত বত্সরের ফেব্রুয়ারিতে নীলফামারীর আশিকুর মোল্লা বাবু নামে একজন ব্যবসায়ী স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়াছেন। আশিকুরের এক চাচাতো ভাই জানাইয়াছেন—বাবার মৃত্যুর পর ব্যাংক হইতে লওয়া ২২ লক্ষ টাকা ঋণ শোধ করিতে গিয়া আশিকুরের ব্যবসায়ের পুঁজি শেষ হইয়া যায়। পাশাপাশি তিনি যে রাখিমালের ব্যবসা করিতেন, সেইখানেও বড় ধরনের লস করেন। এই ধরনের অনেক ঘটনা সাম্প্রতিক কালে সমগ্র দেশে ঘটিয়াছে।

ঋণের কারণে আত্মহত্যার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষ হতাশা হইতে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত লইয়া থাকে। তবে সকলেই ঋণের চাপে একই ধরনের চিন্তা করেন না। হয়তো কোনো একটা সমস্যার কারণে একজন আত্মহত্যার পথে গেলেন, আবার একই ধরনের সমস্যা আরেক জন অন্যভাবে সমাধান করিলেন। ইহা নির্ভর করে মানসিক চাপ সামলাইবার সক্ষমতার উপর। ধর্মের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা মহাপাপ। উহা পলায়নপ্রবৃত্তি। উহা কোনো সমাধান আনে না। বরং ঋণ শোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঋণ শোধের জন্য মেধা খাটাইয়া পরিশ্রম করিতে হইবে। ঋণ শোধ না করিয়া মারা গেলে তাহাতে ইহকাল পরকাল—দুই কালই নষ্ট হয়। মহানবি (সা.) বলিয়াছেন, ঋণ পরিশোধ করা ছাড়া মারা গেলে হাশরের ময়দানে নিজের নেকি হইতে ঋণের দাবি পূরণ করিতে হইবে (বুখারি : ২৪৪৯)। এমনকি আল্লাহর পথে শহিদ হওয়া ব্যক্তিরও যদি ঋণ থাকে, তাহা হইলেও তাহা শোধ করিতে হইবে (নাসায়ি : ৪৬৮৪)।

ঋণের দ্বারা মানুষ যাহাতে জর্জরিত না হয়, তাহার জন্য রাষ্ট্রকেও উদ্যোগী হইতে হইবে। ঋণের বিপরীতে মহাজনদের কম্পাউন্ড সুদের চাপ কিংবা মূল্যস্ফীতির চাপ রাষ্ট্রকেই নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে। প্রচলিত ব্যাংকগুলি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি লইয়া গ্রামগঞ্জে ছড়াইয়া পড়িলে একশ্রেণির মহাজন, ভুঁইফোঁড় এনজিও ও মালটিপারপাস কোম্পানির জুলুমের হাত হইতে রক্ষা পাইতে পারে এই দেশের গরিব-দুঃখী মানুষ।

 

ইত্তেফাক/এমএএম