গভীর জীবনবোধের কবিতা: দুঃসময়ে বড়ো একা হয়ে যেতে হয় 

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২২:৫০

যাপিত জীবনের পরতে পরতে দোল খায় কবিতার পঙক্তি। বিরহ যাপনেও কবিতাই যেন সান্ত্বনার আশ্রয় হয়ে ওঠে। কবি তাই শব্দের মালা গাঁথেন। শব্দের সেই মালা ছড়িয়ে পড়ে আকাশ-মাটি সবখানে। শব্দরা ছড়িয়ে যেতে যেতে যেতে নক্ষত্র হয়ে যায়। সেই নক্ষত্র কুড়োনোর জন্য অপেক্ষায় বসে থাকেন কবিতাপ্রেমী কিছু মানুষ। 

কবির কলমে তাই শব্দরা ধরা দেয় এভাবেই—‘হঠাৎ বেড়ে যায় খেই হারা শব্দের গতি/ পৃথিবীকে এফোঁড়-ওফোঁড় করার বিপরীতে/আকাশের পুকুরে জাল ফেলে নক্ষত্র কুড়োয় কিছু মানুষ’ (আপাত নৈঃশব্দের সরবে যাত্রা)। কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের কলমে কবিতারা এভাবেই ঝংকৃত হয়। 

‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’—মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডিদাসের পৃথিবীশ্রেষ্ঠ এই মানবিক বাণী একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে গানে-কবিতায়। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতায়ও যেন সেই প্রতিধ্বনিই পাঠকের কর্ণকুহরে আলোড়ন তোলে—‘মানুষের জন্যই জন্ম এবং মৃত্যু/পৃথিবীর আদি উৎস থেকে শেষাবধি বৈধ উত্তরাধিকার/সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হও/ মানুষই সত্য—অমানুষ নয়/মানুষের কথাই হৃদয়ে লিপিবদ্ধ হয়’ (মানুষই সত্য-অমানুষ নয়)। 

বড়ু চণ্ডিদাস যেখানে বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। আরিফ মঈনুদ্দীন সেখান থেকে আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে বলে উঠলেন, ‘মানুষের কথাই হৃদয়ে লিপিবদ্ধ হয়।’ 

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা এমনই, যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয় পঙক্তি আকারে। তার কবিতায় যেমন মানুষের কথা উঠে এসেছে। সেই মানুষের যাপন আর হাতাশা, ব্যর্থতা, সাম্য ও ন্যায্যতার কথাও উঠে এসেছে। 

পোড় খাওয়া, ঠকে যাওয়া সময়ের কোনো প্রতিকার না পেয়ে মানুষ যখন গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যায় আরিফ মঈনুদ্দীন তখন কবিতার সুর ধরে সেই হতাশাগ্রস্তদের নিয়ে যান প্রকৃতির কাছে, সত্যের কাছে। বলেছেন, ‘একদিন পেছনে তাকিয়ে দেখি/ আমার ওপর অবিচার করেছেন যিনি/ তিনিও শুয়ে আছেন মরা কাঠের পালঙ্কে/ পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী/ শুধু হাপিত্যেশই সম্বল—তিনি করেছেন কী জীবনে/ ভেবে দেখেন, লালন-করা হাঙর তাকেও খেয়ে ফেলেছে গোপনে’ (অভব্য পরিণাম)। 

কবি লিখেছেন, ‘কত কথা বলে হয়ে যায়/অন্তরালবর্তী উপখ্যানে শব্দরা আলোর করাতের নিচে/আত্মাহুতি দিতে দিতে সাক্ষ্য দিয়ে যায়/বলে যায়, আড়ালের কথা/আরও গভীর গোপন কথা’ (আত্মাহুতি)। কী সেই গভীর গোপন কথা? যা কবি বলতে চেয়েছেন? ‘কাঙ্ক্ষিত সাফল্যধারা যদি অব্যাহত থাকে/ তাহলেই সার্থক জীবনদান/ কেননা জীবন দিয়েই আরেক জীবন আগলে ধরতে হয়’ (আত্মাহুতি)। 

এসব কবিতার পঙক্তি পাওয়া যাচ্ছে কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘দুঃসময়ে বড়ো একা হয়ে যেতে হয়’ শীর্ষক নতুন কাব্যগ্রন্থে। অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ উপলক্ষে বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য ভবন। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মোমিন উদ্দীন খালেদ। দাম রাখা হয়েছে ২০০ টাকা মাত্র। 

ইত্তেফাক/ডিডি