রোববার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

চিকিৎসা-সরঞ্জামাদি আর কতকাল বাক্সবন্দি থাকিবে?

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) ঝটিকা অভিযানে গিয়া নানা ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখিতে পাইয়াছেন। অনেক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি অবস্থায় প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। বলা বাহুল্য, এই মেডিসিন স্টোরেজ হইতে সমগ্র দেশে সরকারি হাসপাতালগুলিতে যন্ত্রপাতি ও ঔষধসামগ্রীর অধিকাংশ সরবরাহ করা হইয়া থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় কর্তৃপক্ষও ক্রয় করেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপনার ছড়াছড়ি স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত বই আর কিছুই নহে।

সরকারি হাসপাতালগুলির যন্ত্রপাতি ক্রয়ের তোড়জোড় সারা বছরই আমরা লক্ষ করিয়া থাকি। ফি বছর জিনিসপত্র ক্রয় করিবার ধুম পড়িয়া যায় যেন! যাহার প্রয়োজন নাই, তাহাও ক্রয় করা হয় অবলীলায়। জেলা-উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষানিরীক্ষার যেই সকল যন্ত্রপাতি রহিয়াছে, তাহার ব্যবহারও হয় খুবই কম। টেকনিশয়ানের অভাবে অনেক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়িয়া থাকে বত্সরের পর বত্সর। একইভাবে সরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অব্যবহূত কিংবা অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকে। ইহাতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হইতেছে। প্রশ্ন থাকিয়া যায়, এই সকল বিষয় দেখিবার জন্য যেই অধিদপ্তর রহিয়াছে, তাহারা কী করিতেছে? মনে রাখিতে হইবে, প্রতিষ্ঠানসমূহ যাহাতে সুষ্ঠুভাবে ও নিয়মমাফিক চলিতে পারে, তাহা নিশ্চিত করাই মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজ; কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্বাস্থ্য খাতকে যেইভাবে অব্যবস্থাপনা গ্রাস করিয়াছে, তাহা হইতে উদ্ধারে চলমান ঝটিকা অভিযান সফল হউক।

এক জরিপে জানা গিয়াছে, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষানিরীক্ষাসহ সকল ধরনের সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকিলেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন রোগীরা। প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর পরীক্ষা করা হয় না উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জনবল থাকিলেও পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য পাঠাইয়া দেওয়া হয় উচ্চমূল্যের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কী সাংঘাতিক কথা! রাজধানী ঢাকা শহর, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরে অধিকাংশ রোগী বাহিরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় যন্ত্রপাতি নষ্টের অজুহাতে। বেসরকারি ঐ সকল প্রতিষ্ঠান হইতে একশ্রেণির ডাক্তার রোগী পাঠানোর নামে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিশন পান। এই বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’!

উপরিউক্ত অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতকে ভোগাইতেছে ‘পদশূন্যতা’। চিকিত্সক, নার্স হইতে শুরু করিয়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য বা খালি পড়িয়া থাকিবার কারণে সেবাবঞ্চিত হইতেছেন রোগীরা। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চিকিত্সক-নার্সের ব্যবস্থা করা কঠিন বটে, তথাপি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও মাথায় রাখিতে হইবে। বরিশাল বিভাগের কথাই যদি বলি, আমরা দেখিয়া আসিতেছি, চিকিত্সকের পদশূন্যতায় জর্জরিত এই বিভাগের অধিকাংশ হাসপাতালে প্রায় ১ কোটি মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব পড়িয়াছে মাত্র ৬৮৮ জন চিকিত্সকের কাঁধে। দেশে চিকিত্সক-সংকট কতটা প্রকট, তাহা এই একটি দৃষ্টান্তেই পরিষ্কার হইয়া যায়। হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার শেষ ভরসা ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি হইতে কী পরিমাণ ভোগান্তিতে পড়িতে হয়, তাহা কেবল ভুক্তভোগীই অনুধাবন করিয়া থাকেন।

স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা বন্ধে দেশব্যাপী ঝটিকা অভিযান অব্যাহত থাকিবে বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হইবে বলিয়াও জানাইয়াছেন। ইহার চাইতে বড় কথা, জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হইবে না বলিয়া হুংকার দিয়াছেন তিনি। মন্ত্রীর এই উদ্যমী তত্পরতাকে আমরা স্বাগত জানাই। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দূরীকরণের মাধ্যমে দেশের সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা-সরঞ্জামাদির সঠিক ব্যবহার এবং রোগী ভোগান্তি লাঘবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা।

ইত্তেফাক/এমএএম