বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৪’। ছয় দিনব্যাপী এবারের পুলিশ সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য— ‘স্মার্ট পুলিশ স্মার্ট দেশ, শান্তি প্রগতির বাংলাদেশ’।
রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু। দেশের মানুষ যখনই কোনো বিপদে পড়ে, সবার আগে আশ্রয় খোঁজে পুলিশের কাছে। পুলিশ জনগণের বন্ধু, এটা সবসময় হয়ে আসছে। পুলিশ বাহিনীকে মানুষের সেবায় আমরা গড়ে তুলছি।’
বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর এই অনুপ্রেরণামূলক বাণী গোটা পুলিশ বাহিনীকে উজ্জীবিত করবে ভীষণভাবে। রসদ জোগাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে।
মনে থাকার কথা, গত বছরের ৩ জানুয়ারি ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৩’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশ সদস্যদের প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছিল, পুলিশকে কতটা ‘আপন’ মনে করতেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুলিশ বাহিনীকে জাতির পিতা সব সময়ই ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের বলতেন, ‘আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন। আপনারা জনগণের পুলিশ।’
‘আপনারা জনগণের পুলিশ’—রাজনীতি সচেতন, দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই কথার সর্বাংশ সাদৃশ্য লক্ষ করার মতো। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—দুই যুগের দুই রাষ্ট্রনায়কের এই সহজ উক্তিই বাংলাদেশ পুলিশের আত্মত্যাগ ও কর্মস্পৃহার আসল স্বীকৃতি।
জাতির পিতা সত্যিকার অর্থেই একটি জনবান্ধব, আধুনিক, পেশাদার ও চৌকশ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরপরই পুলিশের বেতন ২৫ টাকা করে বৃদ্ধি করেন বঙ্গবন্ধু। সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত ৮২টি থানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাণ করেন পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা। আজ পুলিশ বাহিনীতে নারীরা যেভাবে আলো ছাড়াচ্ছেন, তার ভিত্তিও রচিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে। ১৯৭৪ সালে তিনিই প্রথম বারের মতো পুলিশ বাহিনীতে নারী পুলিশ নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।
গত শতকের শেষের দিকে পুলিশের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয় তত্কালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে। পুলিশের বাজেট বৃদ্ধি করা হয়। চালু হয় ঝুঁকি ভাতা। রেশন প্রাপ্তির হার দ্বিগুণ করা হয়। প্রয়োজনীয় যানবাহনের বহর বাড়ে। ৫ কোটি টাকা সিড মানি প্রদান করে গঠন করা হয় ‘পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট’। স্থাপন করা হয় ২৫টি থানা, ৮৬টি তদন্তকেন্দ্র, ৫৮টি হাইওয়ে ফাঁড়ি, ১৫০টি পুলিশ ক্যাম্প ও ১০টি ফাঁড়ি। জনবল বাড়ানো হয় বাহিনীতে। এরপর ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘পুলিশ স্টাফ কলেজ’। আজ যে কমিউনিটি পুলিশের সেবা পাচ্ছে জনগণ, তা গঠনের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয় এই সময়ে।
গর্ব সহকারে বলতে হয়, বর্তমান পুলিশ বাহিনী যে কোনো সময়ের চেয়ে সমৃদ্ধ। এই সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বিশেষ করে বিগত প্রায় দেড় যুগকালে। বাংলাদেশ পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্র্রহণের ফলেই মূলত পুলিশের আধুনিকায়ন সম্ভব হয়েছে। এতে করে বাংলার সর্বস্তরের মানুষ পুলিশের নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছে একেবারে হাতের নাগালে। নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি নানামুখী সমাজসেবা ও উন্নয়নমূূলক কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করে চলেছে পুলিশ বাহিনী।
স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলা, রাজনৈতিক উত্তাপের মুখে হরতাল-অবরোধ, জ্বালা-পোড়াও ও আগুন-সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিরীহ মানুষ হত্যা ও জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের কঠিন মুহূর্তকে সামাল দিতে পুলিশ যেভাবে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে কাজ করে, তা পুলিশ বাহিনীকে গৌরবান্বিত করেছে। নিজের জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সব ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড রুখে দিয়ে পুলিশের সদস্যরা যেভাবে জনজীবনে স্বস্তি ও আস্থা বয়ে এনেছেন, তার ফলে দেশে-বিদেশে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের।
বিশ্বায়নের যুগে বিস্তৃত কর্মপরিসরে বাংলাদেশ পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশের কর্মপরিধিতে যুক্ত হয়েছে সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, মানব পাচার, জলজ ও বনজসম্পদ রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ নানা বিষয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও অপরাধের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। জানমাল রক্ষায় সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন পুলিশের একেকজন সদস্য।
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশকে একটি দক্ষ, চৌকশ স্মার্ট পুলিশ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলে বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশনায়কের এ ধরনের দৃঢ়চেতা মনোভাব পুলিশ বাহিনীর চলার পথকে আরো মসৃণ করবে। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘মানবিক দিক দিয়েই আপনারা সেবা করে যাবেন। আমরা চাই, আমাদের পুলিশ বাহিনী জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী হিসেবেই জাতির পিতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে।’
জনগণের মনে পুলিশের প্রতি যে আস্থা সৃৃষ্টি হয়েছে, তা অক্ষুণ্ন রাখার প্রশ্নে পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্য সদা সজাগ আছেন ও থাকবেন। স্মার্ট পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে প্রত্যয়ী মনোভাব নিয়েই এগিয়ে যাবেন পুলিশ সদস্যরা। সর্বোপরি, জনসেবায় আত্মোত্সর্গ করাই হবে জনগণের পুলিশের একমাত্র লক্ষ্য। পুলিশ সপ্তাহে এই হোক প্রত্যয়-সংকল্প।
লেখক :পুলিশ সুপার, নৌপুলিশ, সিলেট অঞ্চল

