বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভেঙে পড়েছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা

অপুষ্টিতে মরছে শিশুরা, এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে: জাতিসংঘ

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৬:৪০

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে অবিরাম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। স্কুল, শরণার্থীশিবির, মসজিদ, গির্জার পাশাপাশি হামলা হচ্ছে হাসপাতালেও। এতে করে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। এর সঙ্গে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডটিতে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট। এমন অবস্থায় গাজায় অপুষ্টির শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। এছাড়া গাজায় খাদ্যসহায়তার জন্য যারা দাতব্য সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করছে, তাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। এদিকে গাজার এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে ইসরাইলের বর্বর হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় উত্তর গাজার হাসপাতালে পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিতে ছয় শিশু মারা গেছে বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে দুই শিশু মারা গেছে বলে বুধবার মন্ত্রণালয়টি জানায়। এর আগে তারা জানিয়েছিল, উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে চার শিশু মারা গেছে এবং অন্য সাত জন গুরুতর অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উত্তর গাজায় মানবিক বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে বলেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি নৈতিক ও মানবিক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে।’

কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক আহমেদ আল-কাহলুত বলেন, ‘জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে হাসপাতালটি তার পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। মঙ্গলবার জাবালিয়ার আল-আওদা হাসপাতালও একই কারণে পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে সাংবাদিক ইব্রাহিম মুসালামকে গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের শিশু বিভাগের ভেতর বিছানায় একটি শিশুকে দেখাতে দেখা যায় এবং তখন সেখানে বারবার বিদুত্ আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়। মুসালাম বলেন, বিভাগের শিশুরা পুষ্টির অভাবে ভুগছে এবং জ্বালানিসংকটের ফলে ক্রমাগত বিদ্যুিবভ্রাটের কারণে প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলোও কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস বুধবার বলেছে, কামাল আদওয়ান হাসপাতাল বন্ধ হলে সেটি উত্তর গাজায় স্বাস্থ্য ও মানবিক সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। কারণ এই অঞ্চলটি ইতিমধ্যেই দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং ইসরাইল সেখানে সহায়তা মিশনগুলোকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে বা তাদের কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এদিকে ইসরাইলের বর্বর হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯ হাজার ৯৫৪ জনে পৌঁছেছে।

এদিকে গাজার এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় কমপক্ষে ৫ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ বা ভূখণ্ডটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ দুর্ভিক্ষ থেকে এক ধাপ দূরে রয়েছে বলে জাতিসংঘের এক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া না হলে গাজায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ‘প্রায় অনিবার্য’ হয়ে উঠতে পারে। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স (ইউএনওসিএইচএ)-এর কোঅর্ডিনেশন ডিরেক্টর রমেশ রাজাসিংহাম জানান, এভাবে সংঘাত চলতে থাকলে এবং গাজার দক্ষিণে জনাকীর্ণ এলাকায়ও যখন সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, তখন মানবিক বিষয়ক সমন্বয়ের কাজ খুব কমই সম্ভব হবে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, গাজার উত্তরাঞ্চলে দুই বছরের কম বয়সি প্রতি ছয় শিশুর মধ্যে এক শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডের ২৩ লাখ মানুষই কার্যত বেঁচে থাকার জন্য ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপর্যাপ্ত’ খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। রাজাসিংহাম আরো বলেন, জাতিসংঘ এবং সাহায্য গোষ্ঠীগুলো ‘গাজায় ন্যূনতম সহায়তা সরবরাহ পেতেও অপ্রতিরোধ্য বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে ক্রসিং বন্ধ, চলাচল এবং যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ, কঠোর পরীক্ষাপদ্ধতি, অস্থিতিশীলতা, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের মতো বিষয় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে ইসরাইল গাজার মানবিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরাইলের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর জোনাথন মিলার। তার দাবি, সাহায্যের পরিমাণ এবং তা বিতরণের গতির বিষয়ে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো আসলে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

মিলার নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, ‘ইসরাইল তার নীতিতে স্পষ্ট। এর একেবারেই কোনো সীমা নেই এবং আমি আবারও বলছি, গাজার বেসামরিক জনগণের কাছে কী পরিমাণ মানবিক সাহায্য পাঠানো যেতে পারে, তার কোনো সীমা নেই।’

পৃথক প্রতিবেদনে আল জাজিরা বলেছে, গাজা চরম ক্ষুধায় নিমজ্জিত হচ্ছে বলে যখন ত্রাণ গোষ্ঠীগুলো ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করে চলেছে, তখন ইসরাইল চলতি ফেব্রুয়ারিতেও এই ভূখণ্ডে অত্যাবশ্যক মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রচেষ্টাকে আরো সীমিত করেছে।

কিছু মানবাধিকার গোষ্ঠী বলছে, ইসরাইল গাজায় যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করছে।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরাইল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি এই হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থীশিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় ইসরাইলের আক্রমণের ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।

এছাড়া ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

মূলত ইসরাইলি আক্রমণ গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। জাতিসংঘের মতে, ইসরাইলের বর্বর আক্রমণের কারণে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যে গাজার সবাই এখন খাদ্যনিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।

এছাড়া অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ কোনো ধরনের আশ্রয় ছাড়াই বসবাস করছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম ত্রাণবাহী ট্রাক এই অঞ্চলে প্রবেশ করছে।

ইত্তেফাক/এসটিএম