বাংলাদেশের বিমা খাত: অপরিহার্য কিন্তু অবহেলিত

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৭:০৫

সুখবর হলো, আগামী সপ্তাহ থেকে ব্যাংক ইন্স্যুরেন্স চালু হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো করপোরেট এজেন্ট হিসেবে বিভিন্ন বিমাপণ্য ও সেবা বিক্রি করবে। এতে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ তিনটি জীবন বিমা ও তিনটি সাধারণ বিমার পণ্যসেবা বিক্রি করতে পারবে। আজ যখন পহেলা মার্চ সারা দেশে জাতীয় বিমা দিবস পালন করা হচ্ছে, তখন এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।

একটি অর্থনীতিতে কোনো খাতের উন্নয়ন সাধারণত মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) তার অবদান দ্বারা পরিমাপ করা হয়। জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান যে অনুপাত দ্বারা পরিমাপ করা হয়, তা হলো অনুপ্রবেশ অথবা প্রিমিয়াম অনুপাত। মোট প্রিমিয়ামকে জিডিপি দ্বারা ভাগ দিয়ে এ অনুপাত হিসাব করা হয়। ২০২২ সালে বৈশ্বিক গড় অনুপাত ছিল ৬.৭ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে এই অনুপাত ছিল ৪.০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৩.৯ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে মাত্র ০.৯১ শতাংশ। বৈশ্বিক মানদণ্ড ও তুলনীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশ অনুপাত খুবই কম, মাত্র ০.৪০ শতাংশ, যা থেকে বোঝা যায় যে বিমা খাত অন্যান্য খাতের মতো বিকশিত হয়নি। কারণ অনেক। যদিও বিমা পরিষেবা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবকে এর জন্য দায়ী করা হয়,পালটা যুক্তিগুলো আরো শক্তিশালী।

দেশে মোট ৮১টি বিমা কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি জীবন বিমা এবং ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানি। মোট বাজার শেয়ারের ৭৪ শতাংশ জীবন বিমা কোম্পানি এবং ২৬ শতাংশ সাধারণ বিমা কোম্পানি ভোগ করে। মূল প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে কি এতগুলো বিমা কোম্পানি দরকার? উত্তর হলো—না। কারণ ভারতে মাত্র ৫৭টি বিমা কোম্পানি রয়েছে এবং মালয়েশিয়ায় ২৫টি। বাংলাদেশে অনেক বিমা কোম্পানির জন্মই ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশ কিছু কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে অর্থনৈতিক সুবিধার উত্স হিসেবে কিছু কিছু কোম্পানি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এতগুলো বিমা কোম্পানি কোনোভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কোম্পানি হওয়ার ফলে সীমিত সংখ্যক গ্রাহক নিয়ে কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনৈতিক ও অযৌক্তিক প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কোনো কোনো কোম্পানি আবার বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে বিমা খাতের অগ্রগতির অবস্থা এর দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত দেখলেই বোঝা যায়। এই অনুপাতটি দাবির মোট সংখ্যার তুলনায় বিমা কোম্পানি এক বছরে নিষ্পত্তি করে এমন দাবির শতাংশকে বোঝায়। এই অনুপাত যত বেশি হবে, অর্থনীতির জন্য তা তত ভালো। কিন্তু বাংলাদেশে বিমা কোম্পানিগুলোর দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত কত? ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ১৯৭৩-১৯৯০ সময় এটি ছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ, যা ১৯৯১-২০০৮ সময় এসে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯-২০১৯ সময়ের মধ্যে এটি বেড়ে ৭৮ শতাংশ হয়েছে। এই হার ২০২০ সালে আরো বেড়ে ৮৮ শতাংশ হলেও ২০২১ সালে মাত্র ৬৮ এবং ২০২২ সালে ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে, বিশ্বব্যাপী দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত গড়ে ৯৮ শতাংশ। এমনকি ভারতেও গড় দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত ৯৮ শতাংশ এবং তাদের বেশির ভাগ বিমাকারী দাবির অন্তত ৯০ শতাংশ নিষ্পত্তি করে। বাংলাদেশে এই অনুপাতের সাম্প্রতিক অবনতি করোনা মহামারি  ও অর্থনীতির মন্দার কারণে হতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত কম হওয়ার ব্যাখ্যা কী?

কখনো কখনো কিছু পলিসি পরিপক্ব হওয়ার পরও বিমাকারীরা দাবি নিষ্পত্তি করে না। দাবি নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহক শক্তিশালী না হলে তাদের দাবি সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয় না (এমন অভিযোগও রয়েছে বিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। গ্রাহকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক বিমা কোম্পানিকে অল্পসংখ্যক গ্রাহকের পেছনে প্রায় সমজাতীয় পণ্য এবং পরিষেবা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হয়। অন্যদিকে কিছু কোম্পানি তাদের প্রিমিয়াম বিনিয়োগ করে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মুনাফা অর্জন  করতে পারে না। এমনকি কিছু কোম্পানি তাদের তহবিল বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয় কিংবা বিনিয়োগ করলেও সে বিনিয়োগ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এছাড়া কয়েকটি কোম্পানিতে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও তহবিল আত্মসাতের কারণে তারল্য-সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে তারা দাবি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষও মাঝেমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব বিমা কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন প্রকার অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।

নিম্ন দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত এবং দাবি নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব বিমা খাতকে গুরুতর ভাবমূর্তির সংকটে ফেলেছে। এই ধরনের কম অনুপাত নিয়ে বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। কারণ পলিসি নেওয়ার আগে গ্রাহক প্রথমে দাবি নিষ্পত্তির অনুপাতের দিকে তাকায়। দাবি নিষ্পত্তিতে অহেতুক বিলম্ব এটা ইঙ্গিত করে যে বিমাকারী বিমাকৃতের স্বার্থ সংরক্ষণে আন্তরিক নয়। যদিও বিমা খাতের অগ্রগতির জন্য দক্ষ কর্মশক্তি প্রয়োজন, এ খাতটি মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ। এর স্পষ্ট কারণ হলো কম পারিশ্রমিক। গ্র্যাজুয়েটরা যখন অন্যান্য খাতের সঙ্গে এই খাতের প্রাথমিক বেতন তুলনা করেন, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়েন। তাই দেশের মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের কাছে এটি সবচেয়ে কম পছন্দের খাত। ফলে এ খাত তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ কর্মী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

বিমা প্রতিনিধি ও পলিসি-হোল্ডারের মধ্যে ঝুঁকি এবং তার পরিধি নিয়েও এক ধরনের অপ্রতিসম তথ্য বিরাজ করে। যখন কোনো বিমা প্রতিনিধি গ্রাহকের সঙ্গে পলিসি নিয়ে আলোচনা করেন, মাঝেমধ্যে প্রতিনিধি অসম্পূর্ণ কিংবা অতিরঞ্জিত তথ্য প্রদান করেন। অনেক ক্ষেত্রে, পলিসি-হোল্ডাররা পলিসির শর্তাবলি দেখেন না এবং তারা প্রতিনিধির কথার ওপর নির্ভর করেন। যখন পলিসি পরিপক্ব হয়, পলিসি-হোল্ডার প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান দেখতে পান। এটাও দেখা যায় যে অধিকাংশ পলিসি-হোল্ডার প্রথম বছরের পর তাদের পলিসি চালিয়ে যান না। এই অভিযোগ করা হয় যে বিমা প্রতিনিধিরা নতুন পলিসি খুলতে বেশি আগ্রহী কারণ পলিসির প্রথম বছরে তাদের কমিশন পরবর্তী বছরগুলোর তুলনায় বেশি থাকে। এসব প্রতিনিধিদের পেশাদারত্বের অভাব বিমা খাত সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। গত দুই দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আয়বৈষম্যও অনেক বেড়েছে। এই অসম আয়বণ্টন জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে বিমার আওতার বাইরে রেখেছে। তারা বিমা পলিসি গ্রহণ এবং তা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। বিমা খাতে বাংলাদেশে এক ধরনের অসংগতির সৃষ্টি হয়েছে। ধনীদের ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকের বিমা পলিসি রয়েছে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন। এসব ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা না থাকার পরও তাদের অনেকের বিমা পলিসি নেই। এটি শুধু সচেতনতার অভাবের কারণেই নয়, পলিসি কেনার অক্ষমতাকেও অনেকাংশে দায়ী করা যায়। বিমা পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা ও জোগানের মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। কোনো পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে সম্ভাব্য গ্রাহকদের ওপর একটি সমীক্ষা করা উচিত, যাতে সরবরাহকারী গ্রাহকদের সুপ্ত চাহিদা বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী পণ্যটি উদ্ভাবন করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময় পণ্য এবং পরিষেবা বাজারের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই চালু করা হয়। ফলে সেগুলো আর প্রত্যাশিত মাত্রায় বিক্রি হয় না।

২০১০ সালে বিমা আইন প্রণয়নের আগে ব্রিটিশ আইনের অধীনে বাংলাদেশের বিমা খাত নিয়ন্ত্রিত হতো। এই খাতের প্রতি অবহেলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাত্র ২০১০ সালে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যদিও এই খাতটি স্বাধীনতার পর ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চালু হয়েছিল। অথচ ব্যাংক কোম্পানি আইন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। বিমা খাতকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইডিআরএ-এর পর্যাপ্ত জনবলও নেই। এর বেশকিছু কর্মী চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। এছাড়া অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের স্বদিচ্ছা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিককালে কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারি বিমা খাতকে ভয়াবহ অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। পরিচালকরা পলিসি-হোল্ডারদের অর্থ আত্মসাত্ করেছেন। এসব আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। তারা সময়মতো এই কেলেঙ্কারিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের সুষম ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিমা খাতের বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের অর্থনীতিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে মানুষের গড় আয় ও প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এসব সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এই খাতের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব দূর করতে হবে। আস্থা বাড়াতে সঠিক এবং সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি করা দরকার। বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং পরিষেবা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী উদ্ভাবন করতে হবে। তহবিলের বিচক্ষণ ব্যবহারের মাধ্যমে তারল্যের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনতে হবে। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের উচিত নিবিড়ভাবে বিমা কোম্পানিগুলোকে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এটি অন্যান্য কোম্পানির জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং আইন মেনে চলার জন্য তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে। সম্ভাব্য গ্রাহকদের শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে, পণ্য ও পরিষেবা সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করে এবং ডিজিটালাইজেশন ও এর সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যথাযথ অবদান রাখতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসটিএম