দি মনাস্ট্রি অব সাঙ্গাছোলিং স্কাই ওয়াক—পেলিং-এ অবস্থিত ভারতের প্রথম আকাশপথ। গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র শহর পেলিং। রং-বেরঙের বর্ণময় ফুলের রাজ্য, মেঘ আর কুয়াশার রহস্যময় চাদরে জড়ানো ধূসর কখনো বা কাচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশ আর গাঢ় জলপাই রঙের বৃক্ষরাজির সবুজের ফাঁকে হাত দিয়ে যেন ছোঁয়া যায় কিছুটা দূরের রুপালি রঙের কাঞ্চনজঙ্ঘা—এ সবকিছু মিলেই সিকিমের পশ্চিমে অবস্থিত পেলিং শহর।
একটা সময়ে পেলিং ছিল পাহাড়ি গঞ্জ, কিন্তু এখন রীতিমতো পর্যটন শহর। আপার, মধ্য আর লোয়ার মিলে পেলিং শহরকে পায়ে হেঁটেই দেখে নেওয়া যায়। আসা-যাওয়ার পথেই মিলে যায় নানা মানের হোটেল অথবা লজ। হোমস্ট্রে, হোটেল—এ দুই-ই রয়েছে আপার পেলিং-এ, কিন্তু টাকার অঙ্কটা একটু বেশি। আমরা ছিলাম মধ্য পেলিং-এর ওয়ো চেইন হোটেলে। আধুনিক হোটেলটির মেঝে এবং নিচের দিকের দেয়াল কাঠ দিয়ে তৈরি। একেবারেই নতুন আর বেশ ঝকঝকে। খুব বেশিদিন হয়নি তৈরি হয়েছে। ওয়ো চেইন হোটেলের রেস্টুরেন্ট থেকেই ঘুমন্ত গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতির কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখা যায় দৃষ্টির সীমানায়; একেবারে হাতের নাগালের মধ্যে।
চীন, নেপাল ও ভুটান সীমান্তে উঁচু পাহাড়ঘেরা ভারতের ২য় ক্ষুদ্রতম রাজ্য—সিকিম। যার বেশকিছু এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে। এসব উঁচু পাহাড় বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা থাকে। সিকিমের যেদিকে চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। মনে হয় কোনো এক বরফের দেশ। এসব বরফ ও পর্বত দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে এলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব দর্শনীয় স্থান ছিল অধরা আর শুধুই কল্পনা।
গত ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশিদের জন্য সিকিম, অরুণাচল ও কাশ্মিরের লাদাখ উন্মুক্ত হয়। তারপর থেকে পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমীরা পাড়ি জমাচ্ছেন অনিন্দ্য সুন্দর সিকিমে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখে পহেলা ফাল্গুনের রাতে ঢাকা থেকে বাংলাবান্দা সীমান্ত হয়ে সিকিমের উদ্দেশে রওনা করি। ফেব্রুয়ারি মাস অনেক দিক থেকেই আমাদের জন্য অনন্য। পহেলা ফাল্গুন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং শহীদ দিবস, অমর একুশের মাসব্যাপী বইমেলা; অধুনা আমাদের সংস্কৃতিতে যোগ হওয়া ভালোবাসা দিবস—এ সবকিছু মিলে রাজধানী শহর ঢাকা বেশ উত্সবমুখর আর উত্তাল থাকে। এরই মধ্যে আমাদের দুটি পরিবারের সাত সদস্যের ভ্রমণপিয়াসী একটি দল সাদা বরফের হাতছানিতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি বরফের রাজ্য সিকিমে।
শিলিগুড়ি থেকে সিকিমের গ্যাংটক চার ঘণ্টার পথ। আমাদের গন্তব্য প্রথমে গ্যাংটক। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক শহর থেকে ১১৭ কিলোমিটার দূরে ৭,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পেলিং শহর। গ্যাংটক অথবা শিলিগুড়ি যেখান থেকেই হোক না কেন যাত্রাপথে বিশাল পাহাড়ের ঢালে আঁকাবাঁকা সড়ক দিয়ে যেতে চোখে পড়বে অসংখ্য ঝরনা। পুরো যাত্রাপথে সঙ্গী হলো সবুজ পানির তিস্তা নদী! পাহাড়ি সড়কে কখনো বামে কখনো ডানে তিস্তা নদীর দেখা মিলবে। হিমালয়ের হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হওয়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩ হাজার ফুট ওপরে তিস্তা নদী প্রায় ১৭০ কিলোমিটারজুড়ে সিকিম রাজ্যে বয়ে চলেছে। তিস্তার পানি পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি হয়ে অবশেষে মিলিত হয় বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে। গাড়ির চালক তখন নেপালি মেলোডি সংগীত বাজাচ্ছেন। মুগ্ধ চোখে তিস্তার দিকে চেয়ে আছি। সবুজ পানিতে পরিপূর্ণ তিস্তা কোথাও কোথাও বেশ উচ্ছল। কতক্ষণ এভাবে পেরিয়ে গেছে জানি না, হঠাত্ করেই তিস্তার বুকে বিশাল এক কংক্রিটের স্থাপনা—তিস্তা ব্যারাজ মনটা বিষণ্ন করে তুলল। তিস্তার পানি জমিয়ে স্থানে স্থানে জলবিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয়। সবুজ পানিতে পরিপূর্ণ তিস্তার সৌন্দর্য দেখে মনটা বিষাদে ঢেকে যায়। মনে মনে বললাম, ‘তোমার দেশে তিস্তার পানি মাতলামো করে আর আমার দেশে তিস্তা ধু ধু বালুচর।’
ভারতবর্ষের পাহাড়ি রাজ্য সিকিমের পশ্চিমে গেজিং। সে গেজিং জেলার ছোট্ট পাহাড়ি শহর পেলিং। ৭,২০০ ফুট উচ্চতায় এ শহরটি গেজিং থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে। চারদিকে পাহাড় আর কুয়াশার সঙ্গে হিমশীতল ঠান্ডা হাওয়া, ঝরনার চলার শব্দ, সবুজ ঘন অরণ্য, জলপাই রঙের পাহাড়, রং-বেরঙের রঙিন ফুল, পাখির ডাক, কোথাওবা ঝিঁঝি পোকার একটানা ঐকতান, নদীর কুলুকুলু ধ্বনি, মেঘের আড়ালে হঠাত্ কাঞ্চনজঙ্ঘার লুকোচুরি—এ সবকিছুই দেখা মেলে পেলিং-এ। পেলিং আসার অন্যতম উদ্দেশ্য হিমালয় পর্বতমালার তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুব কাছে থেকে দেখা। বরফে ঢাকা শৃঙ্গ দেখে মনে হয় গৌতম বুদ্ধ ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমন্ত বুদ্ধর হাতরাখার উঁচু জায়গাটিই কাঞ্চনজঙ্ঘা।
শৈলশহর পেলিং-এ রয়েছে সাঙ্গাচোলিং মনাস্ট্রি ও সাঙ্গাচোলিং স্কাই ওয়াক; রয়েছে রিনভী জলপ্রপাত, ঘন সবুজ বাগানে গাঢ় কালচে সবুজ কাঁচা কমলা আর কমলা রঙের পাকা কমলা যার স্থানীয় নাম সুলতালা, পাহাড়ের পাশে বয়ে চলেছে রিনভী নদী, রয়েছে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ কেচিভেরী লেক। কিংবদন্তি—হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে বলা হয়, পবিত্র লেকটিতে মহাদেবের পায়ের ছাপ রয়েছে। শুধু হিন্দুই নয়, বৌদ্ধদের কাছেও পবিত্র কেচিভেরী লেক। পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত এ লেকটিতে ট্রেকিং করে যেতে হয়। পেলিং শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাতে জিপ লাইনে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার।
ভারতের প্রথম স্কাই ওয়াক পেলিং-এ অবস্থিত হওয়ার কারণে অনেক পর্যটকের আকর্ষণে পরিণত হয়েছে সিকিমের পশ্চিমে অবস্থিত পেলিং শহরটি। ২০১৮ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয় সাঙ্গাছোলিং স্কাই ওয়াক এবং চেনরেজিগ মূর্তিটি। ৫০০ মিটার আকর্ষণীয় ছোট ছোট লেনের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে প্রায় ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় একটি লুপে। লুপটি পেরিয়ে ১৭০টি ধাপ ওপরে রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি চেনরেজিগ মূর্তিটি। শহর থেকে ১.৫ কিলোমিটারের উচ্চতা ৯,২০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। বেদিটির ভেতর থেকে মূর্তির মোট উচ্চতা ১৩৫ ফুট। পাদদেশেই রয়েছে ১০০টি সিঁড়ি। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ওপরে তাকালে কুয়াশার চাদরে মূর্তিটি দেখে মনে হয়—চেনরেজিগ যেন অতি প্রাকৃতিক অবয়ব ধারণ করেছে। পেলিং থেকে সেদিনই রওনা হব শিলিগুড়িতে তাই খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারছিলাম না সূর্যদেবের সাক্ষাতের জন্যে। চেনরেজিগ বিশাল মূর্তিটির পাদদেশের কাছাকাছি আমাদের বাহনের চালক মণিজি অপেক্ষা করছিলেন। কাচের রোমাঞ্চকর সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলাম ।
নির্মাণাধীন স্কাই ওয়াক কমপ্লেক্সে দ্বিতীয় পর্যায়ে তালিকায় রয়েছে প্রার্থনা এবং কমিউনিটি সার্ভিস হল, একটি ওপেন-এয়ার থিয়েটার, ভিআইপি প্যাভিলিয়ন এবং একটি গাড়ি পার্ক। সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পত্র-পল্লব-পুষ্পে শোভা করবে স্কাই ওয়াক কমপ্লেক্সে।
পাশেই রয়েছে খুব শান্ত আরেকটি আশ্রম। সময়ের টানাপোড়নে দেখা হলো না। সকাল সাড়ে দশটায় আমাদের গাড়ি রওনা করে শিলিগুড়ির উদ্দেশে। সেখান থেকেই পরদিন বুড়িমারী বন্দর হয়ে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পেলিং সাঙ্গাছোলিং স্কাই ওয়াক আর ভিউপয়েন্ট থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসি ঢাকায় নিজেদের ডেরায় ।
সিকিম কীভাবে যেতে হয়
পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে প্রথমত গন্তব্য শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক দিয়ে যেতে লাগবে অন্তত সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। সুমো বা অন্য গাড়ি নিলে ভাড়া গ্যাংটক পর্যন্ত ৩ হাজার টাকার মতো। এভেঞ্জাতে বা লাক্সারি গাড়িতে আরো একটু বেশি ভাড়া। প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রংপোতে সেতু অতিক্রম করার পরে বাম দিকের প্রথম রাস্তায় বিদেশি নিবন্ধন অফিস (এফআরও)। সেখানে নিবন্ধন ও ইনার লাইন পারমিশন (আইএলপি) নিতে হয়। ভিড়ের কারণে মাঝে মধ্যে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু কোনো সমস্যা ছাড়াই পারমিশন পেয়ে আমরা রওনা দেই গ্যাংটক-এর উদ্দেশে।
গ্যাংটক শহরে হাজারো হোটেল-মোটেল আছে। হোটেলের ভাড়া দুই বেডের দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে পর্যটকদের ভরা মৌসুমে এ ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যায়। গ্যাংটক শহর থেকে ১১৭ কিলোমিটার রাস্তা পেলিং-এ গাড়িভাড়া ৪ হাজার। সেখান থেকে শিলিগুড়ির গাড়িভাড়াও ৪০০০ হাজার টাকার মতো। পেলিং ভ্রমণের জন্য পিএ অনুমতি ও গাইডের প্রয়োজন হয় না।
তবে ট্যুর অপারেটর ছাড়া উত্তর সিক্কিম-এ ঘুরার অনুমতি মেলে না। তাই আগে থেকেই ট্যুর অপারেটর ঠিক করে যেতে হবে যেন আগে থেকে সংরক্ষিত এলাকা পারমিশন নেওয়া সহজ হয়।
