গতকাল শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকের তৃতীয় পাতায় প্রকাশিত ছোট্ট একটি সংবাদ অনেক কথা বলিয়া দেয়। সংবাদটির শিরোনাম ছিল—‘ঘিওরে ফের বিদ্যালয়ের প্রাচীর ভেঙেছে দুর্বৃত্তরা’। সংবাদে বলা হইয়াছে, বিদ্যালয় ছুটির পর সন্ধ্যা নামিলেই বিদ্যালয়টি মাদক কারবারিদের দখলে চলিয়া যায়। তাহারা রাতভর মাদক সেবন ও বিক্রি করে। স্থানীয়রা তাহাদের নিকট অসহায়। স্কুল চলাকালেও মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনায় বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে সীমানাপ্রাচীর ও গেট নির্মাণ করে; কিন্তু তাহা ভাঙিয়া দেয় দুর্বৃত্তরা। ইহাতে ক্ষতি হয় ২ লক্ষাধিক টাকার। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানাইয়াছেন, চার বত্সর পূর্বেও সীমানাপ্রাচীর দুর্বৃত্তরা ভাঙিয়া ফেলিয়াছিল এবং সেই ঘটনায় থানায় মামলাও হইয়াছিল। স্পষ্টতই প্রধান শিক্ষকের কথায় বুঝা যাইতেছে, অতীতে মামলা হইয়াছিল; কিন্তু প্রতিকার হয় নাই। দুর্বৃত্তরা এখন আরো সাহসী হইয়া পুনরায় প্রাচীর ভাঙিতে দ্বিধা করে নাই। মাদকের কারবারিদের এহেন দুঃসাহসের অর্থ হইল, এই কাজ তাহারা দীর্ঘদিন ধরিয়া করিয়া আসিতেছে। তাহাই যদি হয়, তাহা হইলে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কী করিতেছেন?
আসলে ইহা একটি এলাকার ক্ষুদ্র একটি চিত্র, যাহা অনেকটা দর্পণের মতো। সেই দর্পণ দিয়া আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাদক কারবারি ও দুর্বৃত্তদের আস্ফাালন এবং সাধারণ জনগণের অসহায়ত্বের চিত্র দেখিতে পারি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অসহায়ত্ব ও পরিতাপের বিষয় হইল—ভিন্ন দল ও ভিন্নমতকে নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন করা। গণতন্ত্রে বহুদল বহুমতকে স্বাগত জানানো হইলেও তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশেই কথিত গণতন্ত্রের শামিয়ানায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধিরা ব্যস্ত থাকেন তাহাদের প্রতিপক্ষকে ‘শায়েস্তা’ করিবার দুষ্কর্ম ও পরিকল্পনায়। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় মানুষের সমস্যা ও তাহার সমাধানে তাহারা সময় দিবেন কখন? বহুক্ষেত্রে মাদক কারবারি তাহাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই জল-বাতাস পাইয়া লতায়-পাতায় তরতাজা ও বড় হইয়া উঠে। আর প্রশাসন? ইংরেজি ভাষায় ‘অ্যাডমিনিসট্রেটিভ এভিল’ বা প্রশাসনে অশুভ শক্তি বলিয়া একটি টার্ম চালু আছে। এই পরিভাষা ব্যবহারকারী গে বি অ্যাডাম, ড্রানি এল ব্যালফোর এবং অ্যাশলি ই নিকেলস তাহাদের রচিত ‘আনমাস্কিং অ্যাডমিনিসট্রেটিভ এভিল’ গ্রন্থে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি উল্লেখ করিয়াছেন তাহা বাংলায় তর্জমা করিলে অর্থ দাঁড়ায়, ‘প্রশাসনিক অশুভ শক্তি থাকে বিদ্বেষপূর্ণ। ইহারা লুকাইয়া থাকে সাংগঠনিক কাঠামোর ছায়ার নিচে।’ এই দুষ্টচক্রের জালে পড়িয়া থাকে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের প্রশাসন।
দেখা যায়, স্বাধীনতাবিরোধীরা যেইভাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করিয়া বসিয়া আছে এবং বসিতেছে, তাহা চিন্তাশীল নাগরিকের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আমাদের বুঝিয়া উঠিতে কষ্ট হয়, এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে তাহারা কী করিয়া পোস্টিং পাইয়া থাকে! এইখানে কোন পরিবার, কাহারা, কী ভূমিকা রাখিয়াছে, কাহার পিতা-পিতামহের পরিচয় কী, তাহা কাহারোই অজানা থাকিবার কথা নহে। অথচ তাহার পরও রাজাকার-আলবদর পোষ্যরা তাহাদের সেই স্বাধীনতাবিরোধী মানসিকতা মস্তিষ্কে বহন করিয়াই প্রশাসন ও সরকারি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে অনেকে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। তাহারা অবাধে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করিয়া নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করিয়া লইতেছে। অন্যদিকে কেহ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কিছু বলিতে গেলেই অনিবার্য হইয়া দাঁড়ায় জেল-জুলুম। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রভৃতি সংস্থা আর রাজনৈতিক দলের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হইয়া পড়ে।
এই অবস্থা নিশ্চয়ই চিরকাল চলিতে পারে না। আজি হইতে প্রায় আশি বত্সর পূর্বে প্রখ্যাত বাঙালি গীতিকার ও সুরকার সলিল চৌধুরী আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার উপলক্ষ্যে লিখিয়াছিলেন—‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা।/ তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির,/ তোমার কারাগারের পেষণ শুধবে তারা/ ও জনতা এই জনতা এই জনতা।’ জনতা চিরকাল ঘুমাইয়া থাকে নাই কখনো। জনগণকে জাগিতেই হয়।
