২০২০ থেকে ২০২১ সাল। একুশ শতকের এই সময়কালটা পৃথিবীর ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও স্মরণীয় অধ্যায়। এক অদৃশ্য শত্রু দ্বারা আক্রান্ত গোটা পৃথিবী। সমগ্র মানবজাতি মুখোমুখি করোনা নামক এক গুপ্ত ঘাতক ভাইরাসের। মহামারি আকারে চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড উনিশ। পৃথিবী জুড়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হচ্ছে। অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাস্কের ভেতরে মুখ লুকিয়েছে মানুষ। দেশে দেশে চলছে কঠোর লকডাউন, কোয়ারেন্টিন। এমনই এক বিভীষিকাময় অচেনা সময়কে চিত্রিত করেছেন লেখক সরোজ মেহেদী তার স্মৃতিগদ্যগ্রন্থ ‘চেনা নগরে অচিন সময়ে’র পাতায় পাতায়। এই বই বিশেষ একটি ক্রান্তিকালের কথা বলে। করুণ ও ভয়ার্ত এক সময়ের সাক্ষী এই বই।
করোনার ভয়াল থাবায় প্রতিটি দেশ তখন বিপর্যস্ত। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীরা মা-মাটির কোলে ফিরতে আকুল হয়ে আছেন। ভারতের চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যনিমেশন বিষয়ে পড়তে যাওয়া লেখকও তাদেরই একজন। প্রবাসীদের দেশে ফেরার আকুতি নিজেকে দিয়েই টের পেয়েছেন তিনি-‘চিরতরে চোখ বোজার সময় শেষবারের মতো চোখ মেলে যেন দেখি শ্যামলিমা মহামায়া বাংলা মাকে।... এটা হচ্ছে- যে মাটিতে জন্ম সেই মাটিতে লীন হওয়ার প্রাণ মাত্রের সুপ্ত বাসনা। মানব মনের এক চিরায়ত চাওয়া।’ কিন্তু দেশে ফিরতে চাইলেই কি তা এত সহজ! পথে পথে হাজারো বাধা-বিপত্তি, বিধি-নিষেধ, অগুণতি জটিলতা, সীমান্ত পাড়ি দিতে সীমাহীন দুর্ভোগ; আস্থা-অনাস্থা, আশা-নিরাশার দোলাচল। অবশেষে কোনোক্রমে দেশে এসে পৌঁছাতে পারলেও বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের বন্দিজীবন। লেখক এসব বিষয়েই আলোকপাত করেছেন এই বইয়ে। যাত্রাপথের সহযাত্রী, ক্ষণিকের পরিচয়ে খুব আপন হয়ে ওঠা কোনো মানুষ, চেনা-অচেনা মুখ, গাড়ির ড্রাইভার, হোটেল কর্মচারী, কোয়ারেন্টিনসঙ্গীসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপচারিতা কিংবা লেখকের স্বগতোক্তিতে উঠে এসেছে- দেশ-কাল, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ইত্যাকার নানান বিষয়-আশয়; রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে লেখকের পর্যবেক্ষণ। কথা প্রসঙ্গে আমেরিকার স্বরাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অন্যান্য দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের তুলনা করতে গিয়ে লেখক মজা করে বলেন, ‘... আমাদের সব দরজা বন্ধ করে রেখেছি যেন কেউ বাহির থেকে এসে ঢুকতে না পারে সেজন্য। অথচ আমাদের ঘরে বেড়া নেই, টিনের চাল বাতাসে উড়ে বেড়ায়, চারপাশে সব খোলা, কেবল দরজা বন্ধ। কী হাস্যকর!’
এই বইয়ে রয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বয়ান। মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য ও স্ববিরোধী আচরণের ব্যবচ্ছেদ করেছেন তিনি। ইঙ্গিত রয়েছে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কসূত্র নিয়ে; এসেছে দুই দেশের নানা অনিয়ম, অনাচার, দুর্নীতির প্রসঙ্গও। সেইসঙ্গে আলো ফেলেছেন আমাদের এই উপমহাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিকে। প্রকাশ পেয়েছে দেশভাগের জন্য লেখকের গভীর দুঃখবোধ। পাশাপাশি, ভারতে থিতু হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাটির টানে এদেশে থেকে যাওয়া দুলাল হালদারদের মতো মানুষগুলোর প্রতিও লেখকের পক্ষপাতিত্ব চোখে পড়ার মতো।
লেখক সরোজ মেহেদীর ভাষাভঙ্গি টান টান। বক্তব্য ঝাঁঝালো। বাক্যের ধার সুতীক্ষ্ণ, যেন ফালা ফালা করে দিতে চায় সকল অনিয়ম, অসংগতিকে। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করতে ছাড়েন না তিনি। গল্পচ্ছলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন প্রতিষ্ঠিত বহু মিথের দিকে। তার গল্পের পরতে পরতে অনায়াসে ঢুকে যায় তীর্যক বাক্যতির। কিন্তু এর গভীরে গোপনে লেপটে থাকে দেশের প্রতি অমোঘ টান, বাঙালি-জীবনের প্রতি মমত্ববোধ, দরিদ্র-অসহায় মানুষের জন্য সহমর্মিতা ও সমানুভূতি।
বাক্যের উদ্দেশ্যকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি আঞ্চলিক শব্দকে টেনে আনেন অনায়াসে। চলতি কথ্যরীতির শব্দ বসিয়ে দেন বাক্যের শরীরে। সেই শব্দটি ‘খাপছাড়া’ ভাবমূর্তি নিয়েও সগৌরবে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়, বাক্যকে রসালো করে এবং একইসঙ্গে সমসাময়িকতারও প্রতিনিধিত্ব করে। আবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে কথার সূত্র ধরে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেলেও সেটির তাৎপর্য টের পাওয়া যায় আরো পরে। তার এই ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাওয়ার কৌশলটি মনে ধরার মতো। কেননা, পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার পূর্বেই তিনি ফিরে আসেন মূল প্রসঙ্গে। এটা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এতে মূল প্রসঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং তার গায়ে প্রক্ষেপিত হয় যুক্তিগ্রাহ্য বহুবর্ণিল আলো। ফলে মূল প্রসঙ্গের ভিত আরো পাকাপোক্ত হয়।
লেখকের রসবোধ প্রশ্নাতীত। তার গল্পের পরতে পরতে লেপটে থাকে রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও কৌতুক। তবে রঙ্গরসের ফাঁক-ফোকরে উচিত কথাটি বলতে পিছপা হন না তিনি। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তাকে দ্রোহী করে তোলে। অসহায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তার মনকে আর্দ্র করে। তিনি নিজেকেও তাদের একজন বলে মনে করেন। এই সংবেদনশীলতাই একজন লেখককে সৃজনকর্মে তাড়িত করে।
আরেকটি প্রবণতা প্রসঙ্গে না বললেই নয়। তার লেখায় স্বগতোক্তির ভেতর ঢুকে যায় বিভিন্ন আপ্তবাক্য কিংবা ঘটনা বর্ণনায় প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে প্রচলিত বিভিন্ন মিথ ও কিংবদন্তি- যা গল্পগুলোর মধ্যে রস ও শক্তি সঞ্চার করে। এটি পাঠকের আগ্রহকে উসকে দেয় এবং প্রলুব্ধ করে পাঠ এগিয়ে নিতে। এসব তার গল্প বলার ধরনের ভিন্নতা। এই প্রবণতা লেখকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে।
এই বইয়ের শেষ কয়েকটা অধ্যায় পড়তে পড়তে আর্দ্র হয়ে ওঠে মন; ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। মনের গহিনে খাঁ খাঁ করে ওঠে এক অনির্ণেয় শূন্যতা। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে করোনা নেগেটিভ যারা, সবাই বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছেন। একদিকে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ, আবার অন্যদিকে কী যেন ফেলে এলাম- এমন এক শূন্যতাবোধ। লেখকের ভাষায়, ‘ঢাকা আসব বলে প্রাইভেট কারে চেপে বসার কিছুক্ষণ পরই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। জানালার ফাঁক গলে আমাকেও ভিজিয়ে দিয়ে যায়। উদাস চোখে আসমানে তাকাই। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। আমার চোখের পানিই যেন আকাশ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঢাকা যাওয়ার যে খুশিটা সকালেও ছিল তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যশোরের পথেপ্রান্তে স্বজন রেখে আমি একা ফিরে যাচ্ছি, ঝিকরগাছা আমারই কোনো আপনজন।’ লেখকের এই শূন্যতাবোধ পাঠককেও জারিত করবে। লেখক বইটির ইতি টেনেছেন কিছু অব্যক্ত বেদনার ভার পাঠকের কাছে জমা রেখে; কিছু প্রশ্নবোধক শূন্যে ঝুলিয়ে দিয়ে। যে প্রশ্নের সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকে চিরনিরুত্তর বিপন্ন বিস্ময়।
এবার একটু কঠিন করে বলি। লেখকের কথার রাশটা আরেকটু টেনে ধরা বাঞ্ছনীয়। গহনার আতিশয্যে যেমন নারীর রূপমাধুরী ঢাকা পড়ে, তেমনি অতিকথার ভারে মূল বক্তব্যও তার সৌন্দর্য হারায়। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে যেমন স্পেস জরুরি, তেমনি যেকোনো লেখালেখির ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ জরুরি। এতে সৃষ্টিকর্মটি আরো সুসংহত হয়। আবার শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিচ্যুতি চোখ এড়ায়নি। এ বিষয়ে লেখকের আরো সচেতন ও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। তবে প্রথম বই হিসেবে লেখককে এটুকু ছাড় দেওয়াই যায়।
বস্তুত, ‘চেনা নগরে অচিন সময়ে’ বইটি করোনাকালীন ঘরে ফিরতে উন্মুখ এক পথিকের জবানিতে বিভিন্ন চরাই-উতরাই, তিক্ত-অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা, পথে পথে প্রত্যক্ষ করা বিচিত্র সব ঘটনা, চলার পথের নানান স্মৃতি-বিস্মৃতির বয়ান। বলা যায়, একুশ শতকের এক বিভীষিকাময় সময়ের দিনপঞ্জি এই বই। আশা করি, পাঠক ‘চেনা নগরে অচিন সময়ে’র ভ্রমণসঙ্গী হয়ে এক ভিন্নমাত্রিক অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
চেনা নগরে অচিন সময়ে
লেখক : সরোজ মেহেদী
প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশক : উৎস প্রকাশন
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০২৪
মূল্য : ৪৪০ টাকা
