অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান স্মরণে

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ২১:২০

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান ইত্তেফাকের ধর্মচিন্তা পাতার একজন একনিষ্ঠ লেখক ছিলেন। তাঁকে আমরা কোনো অ্যাসাইনমেন্ট দিলে বা বিশেষ কোনো লেখার জন্য অনুরোধ করলে তিনি কখনো না করেননি। সমসাময়িক অনেক বিষয়েই তিনি লেখা দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করেছেন। এই গুণী ইসলামি শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, লেখক এবং বিভিন্ন রেডিও-টিভির জনপ্রিয় ধর্মীয় আলোচক ও উপস্থাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান (৪৮) গত শনিবার সকালে উত্তর বারিধারার নিজ বাসায় হূদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন। তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সায়েদাবাদ গ্রামের খানবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে পিতার পাশে সমাহিত করা হয়েছে। আমরা তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকার ফ্যাকাল্টি অব লিবারেল আর্টসের ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ও অ্যাডভাইজার ছিলেন। তিনি ছিলেন ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের এশিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগের চেয়ারম্যান এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামে একই বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি প্রোগ্রামার এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আরবিবিষয়ক খণ্ডকালীন প্রশিক্ষকও ছিলেন তিনি। তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ইসলামবিষয়ক অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন, বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশনসহ অনেক ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে বহু প্রোগ্রাম করেছেন। অনলাইন বা ইউটিউবে গেলে তাঁর সেই সব কালজয়ী লেখা, বক্তৃতা বা সাক্ষাত্কারের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে।  বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে আরবি ভাষায় খবরও পাঠ করেছেন বহু বছর ধরে। রচনা করেছেন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ইসলাম শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক। তিনি একাধিক অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে উপদেষ্টা বা প্রধান সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। গত ২১ জুন ইত্তেফাকের ধর্মচিন্তা পাতায় প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ লেখার শিরোনাম ছিল, ‘ইসলামে ভেজালমুক্ত খাদ্যনীতির নির্দেশনা’।

এ বছর ইত্তেফাকের ঈদসংখ্যায় তাঁর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম, ‘আনন্দবার্তা বয়ে আনে ঈদ-উল-ফিতর’। সংখ্যাটি তাঁকে গত ২ জুলাই মঙ্গলবার হাতে হাতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ২৯ জুন শনিবার তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তিনি ছিলেন দৈনিক প্রথম আলোর ইসলামবিষয়ক ও তারা টিভি নিউজের উপদেষ্টা। ছিলেন ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচালক। ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান ছিলেন একজন সাহিত্যানুরাগী ও নজরুল গবেষক। একসময় তিনি গল্প, কবিতা, ছড়া ও ফিচার লিখেছেন বলে জানা যায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করেন। এজন্য তিনি লাভ করেন স্বর্ণপদক। তার পিএইচডি অভিসন্ধর্ভের বিষয় ছিল, ‘আহমাদ শাওকী ও নজরুল ইসলামের কবিতায় ইসলামি চিন্তাধারা’।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান ১৯৭১ সালের পহেলা ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল নোমান। তাঁর পিতা ড. অধ্যাপক আ ন ম আবদুল মান্নান খান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। এই দেশে আরবি ও ইসলামি শিক্ষার প্রসারে এই খান পরিবারের বিশেষ অবদান রয়েছে। ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান ছিলেন আসলে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। পত্র-পত্রিকায় ইসলামবিষয়ক প্রবন্ধ রচনায় তিনি ভিন্নধারা সৃষ্টি করেন। যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রথমে যেকোনো একটি বিষয়ের ওপর মনোরম আলোচনার পর প্রায় প্রতিটি অনুচ্ছেদের শেষে সেই বিষয়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তুলে ধরেন কুরআন ও হাদিসের যুক্তি। তিনি কুদস কমিটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতিরও ছিলেন সিনিয়র সদস্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সিয়াম সাধনা ও রমজান’ (২০০৮)।  তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রপত্রিকায় ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ত্রীড়াসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে নিরলস লেখালেখি করেছেন। তাঁর এসব রচনা কয়েকটি খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খানকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন।

lলেখক : সাংবাদিক ও বিভাগীয়

সম্পাদক, ধর্মচিন্তা