অগ্নিঝুঁকির জন্য কাহারা দায়ী?

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩৩

ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা নূতন নহে। বেইলী রোডে গত বৃহস্পতিবার রাতে আগুনের ঘটনায় ৪৬ জন মারা গিয়াছেন। গ্রিন কোজি কটেজ নামের সাততলা ঐ ভবনের একটি তলা ছাড়া বাকি সব কয়টি তলায় রেস্তোরাঁ ছিল। ঐ ভবনে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি না থাকায় আগুন লাগিবার পর কেহ বাহির হইতে পারেন নাই। ভবনের সিঁড়িতে রাখা ছিল গ্যাসের সিলিন্ডার। বেইলী রোডের দুর্ঘটনার পর গত রবিবার রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর ও উত্তরার প্রায় অর্ধশত রেস্তোরাঁয় অভিযান চালাইয়াছে পুলিশ। অভিযানে কয়েকটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক, কর্মীসহ অন্তত ২২ জনকে আটক করা হইয়াছে। রাজধানীর ওয়ারীর র্যাংকিন স্ট্রিটের গতকাল সোমবার ১৪টি রেস্তোরাঁয় পুলিশের অভিযানের সময় এমনও চিত্র দেখা গিয়াছে। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সেইখানেও ১৬ জনকে আটক করা হইয়াছে। পুলিশ বলিতেছে, অগ্নিঝুঁকি লইয়াই চলিতেছিল এই সকল খাবারের রেস্তোরাঁ। ইহা ছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কের গাউসিয়া টুইন পিক ভবনে একটি রুফটপ রেস্তোরাঁ ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে এবং ঐ ভবনের ১২টি রেস্তোরাঁ সিলগালা করিয়া দিয়াছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তবে সকল রেস্তোরাঁই যে অনিয়ম করিতেছে, তাহা নহে বলিয়া পুলিশও জানাইয়াছে। অনেক রেস্তোরাঁতেই দেখা গিয়াছে, যেইখানে সকল ধরনের অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন সিঁড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রহিয়াছে।

বেইলী রোডের অগ্নিদুর্ঘটনা ও তাহার পরবর্তী অভিযান লইয়া আমাদের প্রশ্ন হইল—পুরা রাজধানীর শত-সহস্র ভবন যে অগ্নিদুর্ঘটনার উপযুক্ত জতুগৃহের অবস্থায় রহিয়াছে, তাহা তো রাতারাতি ঘটে নাই। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই ধরনের অরাজকতা তৈরি হইয়াছে। অগ্নিঝুঁকি কমাইতে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ নামে ২০০৩ সালে একটি আইন করা হয়। ঐ আইন বলা হইয়াছে, ঢাকা মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস হইতে অনাপত্তির ছাড়পত্র লইতে হয়। ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা, নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভবন হইতে বাহির হইবার বিকল্প পথ, কাছাকাছি পানির সংস্থান, গাড়ি ঢুকিতে পারিবে কি না—এই সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করিয়া ছাড়পত্র দেয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু ঢাকায় মোট কত ভবন রহিয়াছে—তাহারই কোনো হিসাব নাই। যদিও রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) আওতায় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মোট স্থাপনার সংখ্যা ছিল ২১ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৭৪টি। ২০১৮ হইতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরিদর্শন করিয়া ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ঢাকার সকল ভবন পরিদর্শন করিতে পারে নাই, তাহাদের জনবলসংকটও রহিয়াছে। ফলে রাজধানীতে মোট কত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তাহা জানা সম্ভব নহে। সংস্থাটির হিসাবে, তাহাদের তালিকায় ২ হাজার ৬০৩টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তালিকায় রহিয়াছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসিক ভবন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভবনও। ফায়ার সার্ভিসের তরফ হইতে বলা হয় যে, তাহারা অগ্নিদুর্ঘটনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় নোটিশ দিতে পারে কেবল। সুতরাং আমরা দেখিতে পাইতেছি, যেই সকল প্রতিষ্ঠানের অগ্নি-দুর্ঘটনার বিষয়টি দেখিবার কথা, তাহাদের এত বিপুল লোকবল নাই, যাহাতে রাজধানীর সকল ভবনের তদারক করে। এখন লোকবল না থাকিবার জন্য যদি শত-সহস্র ভবনে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহা হইলে সেই জন্য সর্বাগ্রে দায়ী লোকবল ঘাটতির বিষয়টি। আগে যেমন গার্মেন্টসগুলিতে প্রচুর অগ্নি-দুর্ঘটনা ঘটিত, কিন্তু তাহার পর দেখা গেল তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপ তৈরি হইতেছে। ফলে কারখানাগুলিতে কমপ্লায়েন্স এবং নিরাপত্তায় উন্নতি করা হয়।

সুতরাং যাহাদের সমস্যা রহিয়াছে, তাহাদের সর্বাগ্রে সতর্ক করা হউক। সতর্ক করিবার পরও নিরাপত্তার গাফিলতি না থাকিলে আইনি পদক্ষেপ লওয়া হউক। মনে রাখিতে হইবে, রেস্তোরাঁগুলিতে কাজ করিয়া কয়েক লক্ষ মানুষের সংসার চলে। উন্নত বিশ্বে মানুষ রেস্তোরাঁয় গিয়া লাঞ্চ-ডিনার এমনকি পার্টির আয়োজনও করে। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি দেশে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে রেস্তোরাঁ-কালচার বৃদ্ধি পাইবে। সুতরাং, এই সম্ভাবনাময় খাতটির উন্নতিকল্পে পুনর্বাসনসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন