কৃষক পর্যায়ে উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ভোক্তা পর্যায়েও সহনীয় দাম বজায় থাকুক, তা সবার কাম্য। কৃষিজ উত্পাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে। এই অস্থিরতা দূরীকরণে সরকারের রয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। রমজান মাস বেশ কাছে। রমজান ঘিরে বিভিন্ন কৃষিপণ্যসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে মানুষের মনে অস্থিরতা বাড়ে। এই অস্থিরতা নিরসনে সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
কৃষির অভাবনীয় সাফল্যের কথা সবাই অকপটে স্বীকার করে, কিন্তু বাজারে কৃষিপণ্যের দাম যখন সহনীয় মাত্রায় না থাকে, তখন এই সফলতায় ভাটা পড়ে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার কর্তৃক সব কৃষিপণ্যের দাম বেঁধে দেওয়া বেশ কঠিন। কৃষিপণ্যের উত্পাদন খরচ, বাজারজাতকরণ খরচ ও লাভসহ মিলে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। কৃষক চান পণ্যের ন্যায্যমূল্য, ব্যবসায়ীরা চান বেশি মূল্য তথা বেশি লাভ আর ভোক্তারা চান কম মূল্য। এই তিন মূল্যকে সমন্বয় করে একটি পণ্যের ভারসাম্য নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে বাজার অ্যাক্টরদের সমঝোতার বিকল্প নেই। সমঝোতার মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের একটি সহনীয় দাম নির্ধারণ করা গেলে স্বস্তি মিলবে। এখানে সমঝোতা বলতে কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পণ্যের দাম নিয়ে একটি পারস্পরিক বোঝাপড়া। এই বোঝাপড়া যদি সফল হয়, তাহলে সবার মধ্যে একটি উইন-উইন সিচুয়েশন কাজ করবে। তাতে সমাজে পণ্যের দাম নিয়ে অস্তিরতা কমে যাবে। কাজটি বেশ কঠিন মনে হলেও সবার সম্মিলিত প্রয়াসে এটি সম্ভব। তবে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ না করলে পণ্যের দাম কমবে না।
পণ্যের দাম নির্ধারণে আমাদের দেশে এখনো ‘মূল্য কমিশন’ গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে দেশের কৃষক সংগঠনগুলো শক্তিশালী না হওয়া বা কৃষকদের সংগঠন না থাকার কারণে তাঁদের দেওয়া দাম তাঁরা ঠিক রাখতে পারেন না। বেশির ভাগ কৃষক তাদের উত্পাদিত কৃষিপণ্য নিজেরাই এককভাবে বিক্রির কারণে দরকষাকষির সুযোগ কম থাকে। উত্পাদনস্থলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মোটামুটি সংঘবদ্ধ বলা যায়। তাদের তত্পরতার কারণে অনেক কৃষক কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করে থাকেন। তারা কম মূল্যে বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে সেই পণ্যের দাম বেশ চড়া। একই পণ্য বহু বার হাত বদল হওয়া, পরিবহন খরচ বাড়তি ও অন্যান্য চাঁদা ইত্যাদি কারণে একই পণ্যের দাম ভোক্তা পর্যায়ে অসহনীয়। উপরোক্ত কারণ ছাড়াও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির বহুবিদ কারণ রয়েছে। তার মধ্যে সরবরাহ ঘাটতি, সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা, অবৈধ মজুত, সিন্ডিকেট ও ডলারের সংকটকেও দায়ী করছেন বিশিষ্টজনেরা। বিভিন্ন কৃষিপণ্যসহ নিত্যপণ্য অসহনীয় দামে ভোক্তাদের কিনতে হওয়ায় তাদের মনে বাড়ছে অস্তিরতা। এক্ষেত্রে বড় ব্যবসায়ীরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোষ দেন এবং অনেক সময় সরবরাহের ঘাটতি দেখান। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান এই বলে যে, তারা বেশি কমিশনে পণ্য বিক্রি করছেন অথবা পণ্যের দাম ঠিক করে দিচ্ছেন। পারস্পরিক এই দোষ চাপাচাপির কারণে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভোক্তারা।
পণ্যের সহনীয় দাম নির্ধারণে একটি দক্ষ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা দরকার। এটির অনুপস্থিতিতে অনেকে অতি মুনাফা ও লাভের আশায় অবৈধভাবে মজুত করে অথবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অথবা সরবরাহের ঘাটতি দেখিয়ে অথবা বিভিন্ন অজুহাতে পণ্যের চড়া দাম নিয়ে নিচ্ছে। তাতে ভোক্তার মনে কষ্ট বাড়ছে। ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষক কতটুকু লাভবান হলো, তাও বিবেচ্য বিষয়। কৃষক তার উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে পরবর্তী সময়ে তিনি উত্পাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ভোক্তার কাছে কৃষকের পণ্যটি কত দামে বিক্রি হলো, সেই খবর অনেক কৃষক না রাখলেও নীতিনির্ধারণে এই দামের পার্থক্য জানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দামের পার্থক্য যদি বেশি হয়, তবে তার কারণ উদ্ঘাটন জরুরি। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভোক্তা পর্যায়ে সহনীয় দাম বজায় রাখা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে। বাজার মনিটরিং বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর জনবল ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের যুক্তিতর্কসমূহ ভালোভাবে পর্যালোচনা করে কৃষি ব্যবসায় অনুকূল পরিবেশ ও বিনিয়োগসুবিধা বাড়ানো দরকার। তবে অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে তার জন্য কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
উত্পাদনকারীর সঙ্গে সরাসরি ভোক্তার সংযোগ বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন সংক্ষিপ্তকরণ ও কার্যকর করার নিমিত্তে বিকল্প বাজার ব্যবস্থাপনা চালু করা যায় কি না, ভাবা যেতে পারে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি বৃহত্ বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণে চালু করা যেতে পারে সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা। এছাড়া কৃষক সংগঠন শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে দলগত বিপণন (গ্রুপ মার্কেটিং) চালু করা গেলে একই পণ্যের বহুবার হাত-বদলের কারণে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগটি কমে যাবে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কিছুটা হলেও সহনীয় হতে পারে। বিদ্যমান সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার কমিটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণমুখী মনোভাব পোষণের মাধ্যমে সুফল মিলতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক পাওয়ার ও নিজ নিজ এলাকার বাজার কমিটি সম্মিলিতভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজারজাতকরণের সমস্যা চিহ্নিত করে কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করে চাহিদা অনুযায়ী সহনীয় ও যৌক্তিক মূল্যে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও আপত্কালীন সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের মূল্য বছরব্যাপী সহনীয় পর্যায়ে রাখতে জাতীয় কৃষি বিপণন নীতি ২০২১-এ বেশ কিছু সুস্পষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা আছে। পদক্ষেপসমূহের মধ্যে রয়েছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বছরব্যাপী চাহিদা নিরূপণপূর্বক সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্পাদন ও আমদানি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখা; উত্পাদন খরচজনিত মূল্য বৃদ্ধি রোধে কৃষি উপকরণের মূল্য সহনশীল রাখা, প্রয়োজনীয় ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ করা; নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন রোধে যৌক্তিক মূল্য বাস্তবায়ন করা, সেই সঙ্গে কৃষি ব্যবসায় শুদ্ধাচার ও নৈতিকতা বিষয়ে সভা, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা; অবৈধভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুত ও অন্যান্য বেআইনি কার্যক্রম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা; নিত্যপ্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের বিকল্প পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে চাহিদা নিরূপণ এবং যথাসময়ে বাজারজাতকরণে সহায়তা করা। উল্লেখিত কৃষি বিপণন নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলে আশা করা যায়।
লেখক:কৃষি অর্থনীতিবিদ, সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ
