‘মুজিব ভাই আসিয়া/ সোনার বাংলা যাও দেখিয়া’

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪, ০৭:২৮

কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখিয়াছেন, ‘কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠবাণী?/ গণসূর্যে মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি।’ ৭ মার্চের ভাষণ রাজনীতির কবি (পয়েট অব পলিটিকস) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের এক অনন্য সাধারণ বাগ্মিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভাস্বর। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান প্রারম্ভিক দিকনির্দেশনা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষের সম্মুখে বঙ্গবন্ধু যে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন তাহা শুধু বাঙালি নহে, বরং সকল স্বাধীনতাকামী জাতির জন্য এক প্রামাণ্য দলিল। এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, স্বাধীনতার প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং ৩০ লক্ষ প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে লাভ করে চূড়ান্ত বিজয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ২৩ বত্সরের বঞ্চনা ও অত্যাচার-নির্যাতনের চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে এই ভাষণে। তিনি এই ভাষণে সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি দেশের মানুষের অধিকার চাই’। ইহার পাশাপাশি এই দেশের মানুষের অসীম সাহস, শক্তি ও বীরত্বের স্বীকৃতি দিয়া বলেন, ‘আমাদেরকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ সর্বশেষে তিনি এবারের সংগ্রামকে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম বলিয়া অভিহিত করেন।

৭ মার্চের ভাষণকে ইতিমধ্যে বিশ্বসংস্থা ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের মহামূল্যবান দলিল (ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) হিসাবে স্বীকৃতি দিয়াছে। এই ভাষণ মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে (এমওডব্লিউ) সসম্মানে গৃহীত হইয়াছে। ইহাকে ১৮৬৩ সালের আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস, ১৯৪০ সালের উইনস্টন চার্চিলের ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস’ ও ১৯৬৩ সালের মার্টিন লুথার কিংয়ের আই হ্যাভ আ ড্রিম-এর সহিতও তুলনা করা হয়। ৭ মার্চের ভাষণ তাত্পর্যপূর্ণ এই কারণে যে, এই ভাষণে তিনি অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি তাহার সেই শাশ্বত তর্জনি অঙ্গুলি উঠাইয়া ‘আর যদি একটা গুলি চলে’ বলিয়া যাহা কিছু আছে তাহা লইয়াই শত্রুর মোকাবিলা করিবার আহ্বান জানান। এই সাহসী উচ্চারণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং মজলুম মানুষের জন্য উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী। কেননা বাংলার মানুষের সুখ, শান্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি দীর্ঘদিন জেল-জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করেন। তিনি এমন একটি স্বাধীন ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যেই বাংলাদেশে মানুষ চলাচল করিতে পারিবে নির্ভয়ে ও নিঃশঙ্কচিত্তে। নাগরিকগণ ভোগ করিবেন তাহাদের সমস্ত অধিকার। তিনি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছার কথামতো নিজের বিশ্বাসের কথাই বলেন অকপটে ও বলিষ্ঠভাবে। এখানে কোনো কিছু ফুলাইয়া-ফাঁপাইয়া তিনি বলেন নাই। তিনি জানিতেন, বাঙালির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি না হইলে তাহাদের স্বাধীনতা হইবে নিরর্থক। তাই বাঙালি যুগ যুগ ধরিয়া স্বাধীনতার এই মহানায়কের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সহিত উচ্চারণ করিবে।

স্বাধীনতা লাভের পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ও সূচকে অনেক দেশের তুলনায় আগাইয়া গিয়াছে। এই সময়ে সার্বিকভাবে যে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হইয়াছে তাহা অবশ্যই প্রশংসনীয়; কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে ভয়ভীতি ও শঙ্কামুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, তাহা কি আমরা এতদিনেও অর্জন করিতে পারিয়াছি? অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আজও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নিজ এলাকায়, জেলা-উপজেলায় বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হইতেছে। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে রাজবন্দি ছিল। কিন্তু এখন রাজবন্দি বলিয়া কিছু আছে বলিয়া মনে হয় না। অবশ্যই বঙ্গবন্ধু যেমন ইহা চান নাই, তেমনি তাহার আমলে তাহার সহযোগীরাও এমনটি চান নাই; কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয়, আজ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেও অনুপ্রবেশকারী তথা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মামলা-হামলার মাধ্যমে ঘরছাড়া-লক্ষ্মীছাড়া করিতেছে! এমন বাংলাদেশও বঙ্গবন্ধু চান নাই। তাই এই ক্রান্তিলগ্নে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে লইয়া গাওয়া সেই অমর গানের কলিটি মনে পড়িয়া যায়: মুজিব ভাই আসিয়া/ সোনার বাংলা যাও দেখিয়া/ সোনার বাংলা করলো শ্মশান রে/ পাঞ্জাবি বর্বর ইয়াহিয়া/ মেশিন গান আর বুলেট গুলি দিয়া’। অতএব, নিঃশঙ্ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন