ভোটে কিলাকিলি কবে বন্ধ হইবে

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৪, ০৯:৩৪

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ভোট যেন কিলাকিলি ব্যতীত পূর্ণরূপ পায় না। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের বিভিন্ন ভোটের সময় আমরা দেখিয়াছি ভোটে সহিংসতা কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী? সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ভোট গণনাকে কেন্দ্র করিয়া হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। হামলায় আহত হইয়াছেন বেশ কয়েক জন আইনজীবী। হামলার পাশাপাশি ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ রহিয়াছে।

নির্বাচনে কমবেশি হিংসা অনেকটাই যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হইয়াছে। এই জন্য যাহারা নির্বাচনের সহিত যুক্ত থাকেন, তাহারা এই সময়টা চাপ এবং উদ্বেগের ভিতর দিয়া পার করেন। কেবল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতেই নহে, পশ্চিমা দুনিয়ায়ও বহু ক্ষেত্রে নির্বাচনি সহিংসতা ঘটে। তবে যেইখানে আইনের শাসন যত শক্ত, সেইখানে সহিংসতা তত কম। কারণ মারামারি কিলাকিলি করিয়া যদি বিচারের মুখোমুখি হইতে হয়, তাহা হইলে লাভ হইল কী? আসলে ‘হিংসা’ অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের ফলাফল কারসাজির একটা অপচেষ্টার অংশ। নাইজিরিয়া বা মেক্সিকোর মতো দেশের নির্বাচনি ঘটনার দিকে তাকাইয়া বলা যায়, নির্বাচনি হিংসার শিকার হওয়া মানুষেরা, এমনকি হিংসাবিধ্বস্ত অঞ্চলের অন্য ভোটাররাও ভোট দিতে খুব একটা আগ্রহী হন না। ইহাও একটি হাতিয়ার। কারণ বিপক্ষের ভোট কমাইতে হামলা সহিংসতাকে এই ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়। উগান্ডার পরিপ্রেক্ষিতে একটি গবেষণায় দেখা গিয়াছে, নির্বাচনি সহিংসতার শিকার হওয়া মানুষদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উত্সাহ কমিয়া তাহার রেশ বজায় থাকে কখনোসখনো ২০ বত্সর ধরিয়া।

এখন ভোট, অর্থাত্ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যদিও রাষ্ট্রদর্শন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রকে পছন্দ করিতেন না। তিনি মনে করিতেন, গণতন্ত্র হইতে স্বৈরতন্ত্র তৈরি হয়। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রে বিজ্ঞের শাসন দরকার বলিয়া মনে করিতেন। অ্যারিস্টটল বলিয়াছেন, যত রকমের সরকার পরীক্ষা করা হইয়াছে, তন্মধ্যে গণতন্ত্র হইল অধমের মধ্যে উত্তম। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল কোনটি উত্তম সরকার, তাহা নির্ণয় করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে কিছু যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন বটে। তবে স্যামুয়েল হানটিংটন কিছু দিনের জন্য হইলেও গণতন্ত্র বাদ দিয়া উন্নয়নের জন্য স্বৈরতন্ত্র চালু করিবার পক্ষে মত দিয়াছিলেন। তাহার মতে, সরকারের প্রথম জনগণকে শাসন করা দরকার, তাহার পর নিজেকে। কিন্তু সরকারের পক্ষে প্রথমটি অর্জন করা হইলেও দ্বিতীয়টি আর অর্জন করা সম্ভব হয় না। সার্বিকভাবে রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়া বলা যায়, বড় বড় দার্শনিক গণতন্ত্রকে ‘মন্দের ভালো’র বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এখন গণতন্ত্রে নির্বাচন তথা ভোট হইল তুরুপের তাস। আর ইহা ম্যানিউপুলেট করিতে ক্ষমতালিপ্সু অনেকেই মরিয়া হইয়া উঠেন। এই ক্ষেত্রে সহিংসতা, মারামারি, কিলাকিলি চলিয়া আসে স্বাভাবিকভাবেই।

নিক চিজ্মান আর ব্রায়ান ক্লাস যৌথভাবে লিখিয়াছেন, ‘হাউ টু রিগ অ্যান ইলেকশন’। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে দেখানো হইয়াছে কীভাবে নির্বাচনে রিগিং হয়। এই বিশ্বের কোথায় কোথায় কীভাবে ভোট দখল করা হয়, সেই জন্য কী কী ধরনের উপায় অবলম্বন করা হয়—তাহার পর্যালোচনা করা হইয়াছে এই গ্রন্থে। তাহারা দেখিয়াছেন—হিংসা, হানাহানি এই ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। ‘ন্যাশনাল ইলেকশনস অ্যাক্রস ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড অটোক্র্যাসি’ হইতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ইউরোপে নির্বাচনি সন্ত্রাস প্রায় বিরল, লাতিন আমেরিকায় তাহা দেখা গিয়াছে ১৮ শতাংশ নির্বাচনে, এশিয়াতে ৩৯ শতাংশ নির্বাচনে, সাহারা মরুভূমির দক্ষিণবর্তী আফ্রিকাতে ৩৮ শতাংশ, আর সোভিয়েট ভাঙিয়া তৈরি হওয়া দেশগুলিতে ৪৭ শতাংশ। সেইখানে বলা হইয়াছে, কোনো দেশে গণতন্ত্রের ভিত যত মজবুত হইবে এবং আইনের শাসন শক্তিশালী হইবে, নির্বাচনি সন্ত্রাস ততই কমিবে। আর গণতন্ত্র ও আইনের শাসন শক্ত ভিত পায় উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও উচ্চ অর্থনীতির ভূখণ্ডে। শিক্ষা ও উন্নত অর্থনীতি হইল ইহার ভিত্তি। সুতরাং নির্বাচনে মারামারি কিলাকিলি চলিতেই থাকিবে—যতদিন একটি জনপদ এই দুইটি ক্ষেত্রে উন্নত করিতে না পারিবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি