গালফ কো-অপারেশন কাউনসিলের (জিসিসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দিন কয়েক আগে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মিশর, জর্ডান ও মরক্কোর নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বৈঠকে মিলিত হন। গাজায় চলমান যুদ্ধের ফলে এই অঞ্চল জুড়ে ক্রমশ যেসব নেতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, তা নিয়ে আলোচনার জন্যই মূলত নেতাদের এই বৈঠকে বসা। ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার লাগাম কীভাবে টেনে ধরা যায়, তা-ই ছিল বৈঠকগুলোর আলোচ্যসূচিতে। তাছাড়া আসন্ন পবিত্র রমজানের আগে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর অভীষ্ট লক্ষ্যও ছিল নেতাদের সমাবেশের পুরো অংশ জুড়ে। এতটুকুতেই থেমে থাকেনি রিয়াদের ঐ বৈঠক। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কার্যকর সমাধানের প্রশ্নে ভবিষ্যত্ রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়েও আলোচনা করেছেন উপস্থিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের আগুন থেকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল কীভাবে, কোন উপায়ে রক্ষা করা যায়, তা-ও উঠে আসে আলোচনাসভায়।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। কাতারের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে হয়; কারণ, বৈঠক শেষে তিনি বসে না থেকে বরং ইসরাইল-হামাস সংঘাত বন্ধের আলোচনায় উদ্ভূত অচলাবস্থার অবসানের প্রচেষ্টায় উড়ে যান ওয়াশিংটনে।
যা হোক, বৈঠকের পরে এক বিবৃতিতে গাজা যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করেছে জিসিসি। গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণের তীব্র্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে জিসিসির পক্ষ থেকে। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীর প্রতি সহানুভূতি জানানোর পাশাপাশি হতাহতের শিকার লক্ষাধিক মানুষ এবং সেই সঙ্গে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া ভুক্তভোগীদের বিষয়ে গভীর সমাবেদনার কথা বলা হয়েছে জিসিসির বিবৃতিতে।
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রাখার জন্য ইসরাইল যেসব অজুহাত দেখিয়ে আসছে, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বিবৃতিতে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বারবার ভেটো দেওয়ার কারণেই যে যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বাধার মুখে পড়ছে, তার জন্য হতাশাও প্রকাশিত হয়। গাজায় ফিলিস্তিনিদের অবর্ণনীয় কষ্ট-দুর্ভোগ সত্ত্বেও তাদের জীবনমান যেভাবে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ বন্ধে গত বছরের ডিসেম্বরে গৃহীত ‘ইউএনএসসি রেজল্যুশন’ বাস্তবায়িত না হওয়ার পুরো দায় ইসরাইলের। কারণ, ইসরাইল কোনোভাবেই সমঝোতার রাস্তায় হাঁটার চেষ্টা করছে না! বরং গাজায় নির্বিচার হামলা তো অব্যাহত রেখেছেই, সেই সঙ্গে দুর্ভোগের শিকার গাজাবাসীকে সাহায্য করার সব ধরনের প্রচেষ্টা অবরুদ্ধ করে তুলেছে। যুদ্ধের শিকার কিংবা অবরুদ্ধ মানুষের কাছে কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা পাঠানোর চেষ্টা করা হলে তা-ও আটকে দিচ্ছেন ইসরাইলের সেনারা।
এহেন করুণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করার কথা জানিয়েছে জিসিসি। দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্ম সংস্থার প্রতি। দাতাদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মাধ্যমে অর্থসহ সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। বিবৃতিতে এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে জিসিসি। এ ধরনের একগুঁয়েমিপনার কারণে ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বানও জানানো হয়।
বিবৃতিতে মন্ত্রীরা জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিশ্বের প্রত্যেক জাতিকে আহ্বান জানাই আমরা। উল্লেখ্য, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে সম্মতি জ্ঞাপন করা রাষ্ট্রের সংখ্যা এখন ১৪০। উপরন্তু, এমন অনেক দেশ রয়েছে, যারা ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াতে উচ্চকণ্ঠ। ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যরাষ্ট্র করার ক্ষেত্রে ইউএনএসসিকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানিয়ে আসছে এসব দেশ।
আরব লিগ ও ইইউর সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সৌদি আরবের উদ্যোগকে সমর্থনের পাশাপাশি এ ধরনের প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করার বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা বলছে বিভিন্ন দেশ, যা উঠে এসেছে জিসিসির বিবৃতিতে। এ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নতুন করে ইসরাইলের আবাসন নির্মাণের ঘোষণার মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীরে যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়েও কড়া ভাষায় কথা বলা হয় রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে।
মনে রাখা দরকার, পবিত্র মাহে রমজান সন্নিকটে। কদিন বাদেই শুরু হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সিয়াম সাধনার মাস। স্বাভাবিকভাবেই এ মাসে জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বাড়বে। ঠিক এমন এক সময়ে নতুন করে হামলার হুংকার দিয়ে রেখেছে ইসরাইল। বলা বাহুল্য, এ নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার শেষ নেই। নিকট অতীতে ত্রাণ নিতে আসা গাজাবাসীর ওপর হামলার ঘটনায় রক্তের বন্যা বয়ে যেতে দেখেছি আমরা। একইভাবে সত্যি সত্যিই যদি জনাকীর্ণ এলাকা বা স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে, তাহলে কী পরিমাণে রক্ত ঝরবে, তা সহজেই অনুমেয়।
ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ যে কেবল গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয়। বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশও জ্বলে উঠবে গাজা যুদ্ধের আগুনে। বিশ্লেষকদের অভিমত, ইসরাইলের আগ্রাসনকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে এই অঞ্চল চরমভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। মাথায় রাখা দরকার, দীর্ঘদিন ধরে ইরানের দখলে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বীপগুলোতে নতুন করে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। এতে করে যে নতুন সহিংসতা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ মোখবার গত ১১ জানুয়ারি উল্লিখিত অঞ্চলে আবাসন প্রকল্প, অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণসহ ‘দ্বীপগুলোর উন্নয়ন’ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্র্রাহিম রাইসি এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। অধিকৃত এসব দ্বীপে সামরিক মহড়ার আয়োজনও করা হয়। এ ধরনের প্রবণতা কূটনীতি ও আঞ্চলিক পুনর্মিলনকে জটিল করে তুলতে সময় নেবে না।
পারস্য উপসাগরে ইরান ও কুয়েতের জলসীমায় অবস্থিত আদ-দুররা গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে পুরাতন ঝামেলা মাথাচাড়া দিয়েছে গাজা যুদ্ধের কারণে। ইরানকে বাদ দিয়ে এই গ্যাসক্ষেত্রের সম্পদ উত্তোলনের ব্যাপারে কুয়েত ও সৌদি আরব যে চুক্তি করেছিল, তা নিয়ে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে আগামী দিনগুলোতে। ইরান বরাবরই এ ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।
উল্লেখ্য, কুয়েত ও সৌদি আরব এই গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা দাবি করে থাকে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কুয়েতের জলসীমা ঠিকঠাকমতো মাপজোক করা হলে গ্যাসক্ষেত্রের বেশির ভাগ পড়বে ইরান সীমান্তের মধ্যে।
গাজা যুদ্ধের রেশ বয়ে যাচ্ছে সিরিয়ায়। অভিযোগ রয়েছে, ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের জর্ডান-সিরিয়া সীমান্তে হামলা চালানোর কারণে এই অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠছে। এত করে মাদক পাচার নির্মূলে সিরীয় সরকারের প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম।
গাজা যুদ্ধের আরেক শিকার ইয়েমেন। হুতি বিদ্রোহীদের লোহিতসাগরে বাণিজ্য জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার মধ্য দিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। এর অভিঘাতে বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও হুতিদের থামাতে পারছে না। ফলে ইয়েমেন অঞ্চলে হুতিদের মাধ্যমে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।
কোনো সন্দেহ নেই, গাজা যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এই অঞ্চল তো বটেই, আশপাশের এলাকায়ও আছড়ে পড়বে সংঘাতের দামামা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে মারাত্মকভাবে। এরকম এক পটভূমিতে গাজা সংঘাতের অবসান ঘটানো অতি জরুরি। ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ লাঘবেই কেবল নয়, বিশ্বব্যাপী যাতে সংঘাত আছড়ে না পড়ে, তা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থেই ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। গাজা যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে জিসিসি সব সময়ই সরব ভূমিকা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
লেখক: গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের রাজনীতি ও মধ্যস্থতাবিষয়ক সহকারী মহাসচিব
আরব নিউজ থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন
