প্রতি বত্সর মাহে রমজান উপলক্ষ্যে উমরাহ টিকিটের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ইহাতে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী এয়ারলাইনসগুলির টিকিট পাওয়া কঠিন হইয়া পড়ে। উমরাহ টিকিট ক্রয় করিতে গিয়া যাত্রীদের যেমন হয়রানির শিকার হইতে হয়, তেমনি অতিরিক্ত ফ্লাইট ভাড়া আদায় করায় তাহারা বিপাকে পড়েন। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক খবরে বলা হইয়াছে যে, অধিকাংশ এয়ারলাইনস বেসিক ইকোনমি ক্লাসের টিকিটগুলি বিক্রি বন্ধ করিয়া অতিরিক্ত মূল্য ধরিয়া ইকোনমি ফ্লেক্সি ও ইকোনমি প্রিমিয়াম ক্লাসের মূল্য হাঁকিতেছে। জেদ্দা ও মদিনা রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনাকারী বাংলাদেশ বিমান ও সাউদিয়া এয়ারলাইনসে স্বাভাবিক সময়ে আসা-যাওয়ার ভাড়া যেইখানে ৭০-৭৫ হাজার টাকা, সেইখানে এখন ভাড়া নেওয়া হইতেছে ১ লক্ষ ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এইখানে সিন্ডিকেট গড়িয়া তুলিয়া কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে টিকিটপ্রতি অতিরিক্ত ৪০-৪৫ হাজার টাকা আদায় করা হইতেছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। থার্ড ক্যারিয়ার হিসাবে কথিত এয়ারলাইনসগুলিও আদায় করিতেছে বাড়তি অর্থ।
সাধারণত বাজারে চাহিদা বাড়িলে এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহে ঘাটতি থাকিলে যে কোনো কিছুর মূল্যবৃদ্ধি পাওয়াটা অস্বাভাবিক নহে; কিন্তু যখন কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে কোনো কিছুর মূল্য অনৈতিকভাবে দেড় হইতে দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়া যায়, তখন সেই ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হইয়া পড়ে। এয়ারলাইনসগুলির বক্তব্য হইল, রমজান মাস আসিলেই উমরাহ যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, সেই অনুযায়ী তাহারা চাহিদা মোকাবিলায় পূর্ব হইতেই ব্যবস্থা নেন না কেন? হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) বর্তমান নবনির্বাচিত সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম আমাদের টেলিফোনে জানাইয়াছেন যে, উমরাহ যাত্রীদের এই দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ বিমানের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা আবশ্যক। তাহারা নায্য ভাড়া নিলে অন্যরাও তাহা লইতে বাধ্য হইবে। এই বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান ইত্তেফাককে জানাইয়াছেন যে, এয়ারলাইনসের কমার্শিয়াল ফ্লাইটগুলি দেখিবার কোনো এক্তিয়ার তাহাদের নাই; কিন্তু যাহারা টিকিট গায়েব করিয়া কালোবাজারে বিক্রয় করিতেছে, তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তাহা হইলে কে বা কাহারা নিবেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্র মাহে রমজানে কেহ উমরাহ পালন করিলে তাহা ফরজ হজের সমান গণ্য হয়। ইবনে ‘আব্বাস (রা.) বলিয়াছেন, ‘একজন আনসার নারী রসুলুল্লাহ (স.)-এর সহিত হজ করিতে পারেননি। তিনি তাহাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে উক্ত নারী তাহার বাহনের অপারগতা প্রকাশ করেন। ইহার সমাধানে তাহাকে রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তুমি আসন্ন রমজানে উমরাহ পালন করিবে। কারণ, রমজানের একটি উমরাহ (বিধিবদ্ধ সময়ে) পরিপালিত একটি হজ বা হজের সমান।’ (বুখারি :১৭৮২) যেহেতু সাম্প্রতিক কালে ডলার-সংকটসহ নানা কারণে হজের খরচ বাড়িয়া গিয়াছে, তাই অনেক মুমিন-মুসলমান এখন উমরাহ আদায়ের প্রতি ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আর রমজান মাসে যে কোনো ইবাদত ও ভালো কাজের সওয়াব অন্য যে কোনো মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। এমনকি রমজানের শেষ দশকে বত্সরের বা মাসের যে কোনো দশকের চাইতে রাতব্যাপী সবচাইতে অধিক ইবাদত করিতে হয়। রসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবা-ই-কিরাম সপরিবারে বিনিদ্র কোমর বেঁধে নামিতেন এই শেষ দশক পরিপালনে। (বুখারি :২০২৪, মুসলিম : ১১৭৪)। তাই দেখা যায়, রমজানের শেষ দিকে উমরাহ ও ইতিকাফ পালনের জন্য ইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কা-মদিনায় যাতায়াতকারীর সংখ্যা আরো বাড়িয়া যায়। এই সময় সেইখানকার হোটেল ভাড়াও অধিক থাকে।
মোদ্দা কথা, ডিমান্ড-সাপ্লাই রীতি অনুযায়ী কোনো কিছুর মূল্য বৃদ্ধি পাইলেও ধর্মীয় বিষয়াদির ব্যাপারে আমাদের উচিত যথাসাধ্য সমস্যার সমাধান করিয়া ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা। এই জন্য সৌদি আরব ও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিমান এয়ারলাইনসগুলির কর্তৃপক্ষের উচিত এই ব্যাপারে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া এবং এই সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নতি বিধান করা।
