বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বরিশালের ‘মলিদা’ এখন শুধুই স্মৃতি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৭:০০

‘আমাদের সময় ইফতারিতে সাধারণত একটা মিষ্টি থাকত আর সেটা হচ্ছে শিন্নি, আমরা আধুনিকতায় যা বলি ফিরনি। সেটা খেজুরের রস কিংবা আখের গুড়ে তৈরি হতো। এছাড়া মুড়ি, খই, কলাসহ বিভিন্ন দেশীয় ফল থাকত। তবে সবচেয়ে বেশি প্রচলন ছিল “মলিদা” নামে একটি খাবারের, যেটা এখন সচরাচর দেখা যায় না।

“মলিদা” চালের গুঁড়া, গরুর দুধ, নারিকেল দিয়ে তৈরি হতো। এটি অনেক জনপ্রিয় খাবার ছিল, যেটা সবার ঘরেই একটা সময়ে তৈরি হতো। তবে এখন আর তেমন দেখা যায় না। এছাড়া আমাদের সময়ে ইফতারি হতো খুব অল্প সামগ্রী দিয়ে—অর্থাৎ চিড়া, কলা, মুড়ি মাখিয়ে ইফতারি করতাম। তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ে এসে পান্তা (পানি দেওয়া) ভাত খেতাম।’ বলছিলেন বরিশাল নগরীর বিশিষ্টজন হিসেবে পরিচিত ৯৩ বছর বয়সি মানবাধিকার জোটের জেলা শাখার সভাপতি ডা. সৈয়দ হাবিবুর রহমান।

গত শতকের ৬০-৭০ দশকে যারা বরিশালে বড় হয়েছেন, তারা জানান, ইফতারের সময় সাইরেন বাজলে পানি মুখে দিতাম। প্রচণ্ড গরমকালের রোজায় বরফ কিনতে পাওয়া যেত। সেই বরফে কাঠের গুঁড়া মাখানো থাকত, যাতে চটজলতি গলে না যায়। কারণ এখনকার মতো ঘরে ঘরে ফ্রিজের ব্যবহার ছিল না। রমজান মাসে পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ইফতারি পাঠানো হতো।

এসব ইফতারিতে আখের গুড়ের শরবত, বুট বিরাজ, ডালের বড়া, চালের বিরান, মুড়ি থাকত। আর মসজিদে ইফতারিতে থাকত চাল ও পানি দিয়ে রান্না করা জাউ। তার সঙ্গে গুড় দিয়ে পরিবেশন করা হতো। মাঝে মাঝে বুট ভাজি হতো সঙ্গে মুড়ি অথবা চালের পায়েস—যাতে নারিকেল, তিল ও গুড় থাকত।

সত্তরোর্ধ্ব সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক আনিসুর রহমান স্বপন বলেন, ‘আমার ছোটবেলায়, অর্থাত্ কিশোর বয়সে ইফতারিতে বেশি থাকত চিড়া, ঘোল-মুড়ি. দেশীয় বিভিন্ন ফল। মায়ের হাতে তৈরি করা ছোলাবুট, ডালের বড়াসহ বিভিন্ন খাবার। এছাড়া থাকত গরুর মাংস, মুরগির মাংস, লাল চালের তৈরি রুটি, ভাত। সেই আমলে যদি কোনো বাড়িতে ইফতারের দাওয়াত দিত, তখন এই খাবারগুলো বেশি খাওয়াত। আগের দিনে রোজাদারেরা ইফতারে স্বাস্থ্যকর খাবার বেশি রাখতেন। কিন্তু বর্তমানে রোজাদারেরা যে সমস্ত খাবার খান, তাতে শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর শাহ্ সাজেদা (৬৩) বলেন, ‘আমাদের শৈশবে সাধারণত আমরা চিড়া, মুড়ি, খই, কলা খেতাম ইফতারিতে। পাশাপাশি আমাদের মায়েরা আলাদা করে ডালের বড়া, বিভন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করতেন। এছাড়া দেশীয় বিভিন্ন ফল খেতাম। এখন যেমন ইফতারিতে খেজুর খাওয়া হয়, আমাদের সময়ে খেজুর তেমন একটা পাওয়া যেত না আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল না।

আবার আমাদের সময় কাবুলিওয়ালা ছিল, যারা কিনা চালের বিনিময়ে কিশমিশ ও পেস্তা বাদাম দিত, সেটাও সাধারণ মানুষ খেতে পারত না। আমাদের সময়ে জিলাপির অনেক প্রচলন ছিল, আমরা ইফতারিতে জিলাপি খেতাম। সে সময় খেজুরের গুড় অনেক পাওয়া যেত, আমরা চিড়া, মুড়ি, খই, চালভাজা সেই গুড় মাখিয়ে খেতাম। আসলে সেই খাবারই ছিল সেই সময়ের জনপ্রিয় খাবার। আর এখন মানুষ ফাস্টফুডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন