ডাকিনীরপাট। ছায়াঘেরা ছোট একটি গ্রাম। অনেক আগে এখানে জনবসতি ছিল একেবারেই কম। একপাশে ডাকিনী-যোগিনীর পাট। চারপাশে বড় বড় শ্যাওড়া গাছ। রাত হলে খেলা করত ডাকিনী-যোগিনী। এখন ধীরে ধীরে বদলে গেছে সে ইতিহাস। তবে আজো মন থেকে ভয় যায়নি বয়োজ্যেষ্ঠদের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মুখে মুখে চলে আসছে সে কল্প-কাহিনী।
জানা যায়, কয়েক প্রজন্ম আগেও দিনের আলো মিলিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার চারপাশ ঘিরে ধরলেই শুরু হত তাদের খেলা। এলো কেশে বড় বড় দুই গাছের মগডালে জিহ্বা বের করে দাঁড়িয়ে থাকত দানবীয় ছায়া মানবী। যার গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট চোখ। ছোটাছুটি করে অসংখ্য আগুনের কুণ্ডলী। মিউ মিউ করে উজ্জ্বল চোখে দৌড়ায় কালো বিড়াল। কখনো গাছে উঠে। পরক্ষণেই সরসরিয়ে নেমে পড়ে। শোনা যায় ছোট বাচ্চার কান্না। বেড়িয়ে পড়ে বড় বড় কাল্পনিক সাপ। রাতের নি:স্তব্ধতা বাড়লে এটি আরও বাড়ে। ভয়ে বের হতে চাইত না কেউ। তাই সন্ধ্যার পরে সন্তানদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত বাবা-মা। এ গল্প এখনো ঘুরছে মানুষের মুখে মুখে। গা ছম ছম করা সে গ্রাম ডাকনিরপাট উপজেলা সদরের অতি সন্নিকটে পৌরসভা সীমানায় ভিতরবন্দ ইউনিয়নে। কেউ কেউ একে কোচপাড়া হিসেবেও চেনে।
স্থানীয় অশিতীপর বৃদ্ধ খুদু মামুদ, সত্তরোর্ধ গোপাল, বীরেন্দ্র নাথ রায়, দুলু মিয়াসহ অনেকেই জানান, আগে দিনের বেলাতেও মানুষ এ পথে যেতে সাহস পেত না। একা কেউ গেলে ভয় পেত। তাদের সামনে দাঁড়াতো বিশাল দৈতাকার ছায়া মানব। লক লক করত জিহ্বা। ক্রমে বড় হত। সে জিহ্বা দিয়ে গা চাটার চেষ্টা করত আগুন্তকের। রাস্তা আটকিয়ে পড়ে থাকত বাঁশ। এর উপর দিয়ে গেলে তাকে উপরে উঠিয়ে দিত। ফট ফট করে বাঁশ ফাটানো বা খট খট শব্দ হত কাটার। যদিও আশেপাশে কারো দেখা পাওয়া যেত না। সন্ধ্যা হলে এর রূপ আরও বদলে যেত। আলো আধারী ও আবছা অন্ধকারে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকত সাদা কাপড় পরিহিত ঘোমটা দেয়া ছায়া মানবী। পাশে পড়ে থাকত অনেকগুলো হাত, পা, মাথা বিহীন ছোট বাচ্চার মরদেহ। সেখানে শুয়ে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর মত টোয়া টোয়া করে অনবরত কেঁদে চলছে সেগুলো। ভুল করে পাশে গেলেই বিপদ। কোনভাবে সেখান থেকে আসতে পারলে নারী কণ্ঠে ভেসে আসত “যা বেচে গেলি”। আর আসিস না কোনদিন।
এগুলো দেখে অনেক গর্ভবতী মহিলার অসময়ে গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটেছে এলাকায়। একা একা এ পথে যেতে সাহস পেত না কেউ। দিনের বেলাতেও দলবেঁধে ভিতরবন্দ বাজারে যাওয়া-আসা করত মানুষ। অনেকেই ভিন্ন পথে অনেকটা ঘুরে যেত। আবার দ্রুত ফিরে আসত বাড়ীতে। সন্ধ্যার পরে ফের নির্জনতা ঘিরে ধরে চারপাশ। বেরিয়ে পড়ে কাল্পনিক সব ভুত-প্রেত ও ডাকিনী-যোগিনী।
পাশের গ্রাম চৌবাড়ীর অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক নব্বই ঊর্ধ্ব সুকান্তি নিয়োগী পিকলু ভট্টাচার্য জানান, মুক্তিযুদ্ধের আগের বছরের ঘটনা। সেদিন ছিল ভিতরবন্দ হাট। সওদা করতে গেছেন যুবক ইমান আলী। ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মনের জোড়ে ফিরছিলেন ডাকিনীরপাট তথা কোচপাড়া দিয়ে। জন মানুষহীন ফাঁকা রাস্তা। প্রথম সন্ধ্যায় আশপাশ ও দুরের ঘর-বাড়িতে তখন কেবল এক এক জ্বলে উঠছিল কেরোসিন কুপি। অন্ধকার তখনো আবছা। বুকে থু থু ছিটিয়ে সাহস করে আপনমনে গুনগুনিয়ে গুনাই বিবির গান গেয়ে কোঁচপাড়া দিয়ে ফাঁকা রাস্তা ধরে ফিরছিলেন বাড়ী। হঠাৎ দেখেন রাস্তার দুপাশে দুটি বড় শ্যাওড়া গাছের মগডালে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে বিশালাকৃতির এক ছায়া মানবী। মুখমণ্ডলে অসংখ্য চোখ। আবছা আলোয় জ্বল জ্বল করছে সেগুলো। প্রায় দেড়হাত লম্বা জিহ্বা বের হয়ে লক লক করছে। সামন দিয়ে হি হি হা হা করে আগুনের কুণ্ডলী নিয়ে ছুটছে মস্তকবিহীন ছোট মানুষ আকৃতির কিছু ছায়া। এসব দেখে ভয়ে আতংকে লেজেগবুরে অবস্থা তার। গলা শুকিয়ে গেছে। কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। দিগ্বিদিক চিন্তা না করে এক সময়ে প্রাণভয়ে দেন দৌড়। প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসে পরে যান চৌ-বাড়ীর উঠোনে। প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মত অবস্থা তার। নিমিষেই খেয়ে ফেলেন এক কলস পানি। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে সেদিন এ কথা বলেন ভীত ইমান আলী। এরপর এক সময় প্রবাদ ছড়িয়ে পরে “মরবার জন্যে কোঁচপাড়া দিয়ে যাওয়া।”
স্থানীয় আরেকজন জানান, প্রায় প্রতিরাতে বিধবা বেশে সাদা কাপড়ে ঘোমটা টানা এক মহিলা মাটিতে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন সেখানে। অজানা অচেনা লোক হয়তো ভেবেই বসতেন কোন অসহায় মহিলা বিপদে পড়ে এখানে এ অবস্থায়। তার সাহায্য প্রয়োজন। হাত বাড়িয়ে তাকে তুলতে গিয়ে দেখেন ধরা যাচ্ছে না। তখনই অট্টহাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ঐ ছায়া মানবী। ঘোমটা সরিয়ে বড় বড় চোখে বের করে লকলকে জিহ্বা। কোলে হাত, পা, মাথা বিহীন বুকে এক চোখ বিশিষ্ট একটি শিশু। এটি দেখে ভয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তারপর সে ভুত ছাড়াতে বাড়িতে আয়োজন বসত কবিরাজি ঝাড়ফুকের।
এরপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। এ গ্রামের বসতিতে বেড়ে উঠা সন্তানরা তখন স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করে। তারা এ ভয়ের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে এক শীত মৌসুমে গ্রামের পরিত্যক্ত জমিতে দাগ কেটে শুরু করে ব্যাডমিন্টন খেলা। একদিন গ্রামের বয়স্কদের ভাবনায় আসে ভয় কাটাতে দরকার জন সমাগম বাড়ানোর।
ভাবনা থেকে উদ্যোগ। প্রায় ৩০ বছর আগে সকলকে ডেকে বৈঠক করে লাঠিখেলার আসর বসায় তখনকার দিনে গ্রামের উদ্যমী মধ্যবয়স্ক দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী। এরপর সেখানে ডাকিনীরপাট মন্দিরের পাশে আব্দুর রহমানের জমিতে বাজার বসে। উন্নয়নে সহায়তা করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর ইসলাম।
সাবেক ইউপি সদস্য রতন রায়, স্কুল শিক্ষক ও সংবাদকর্মী নুরুজ্জামান মিয়া জানান, এরপর ধীরে ধীরে বেড়েছে বাজারের পরিধি, মানুষের উপস্থিতি, কমেছে ভুত-প্রেত নিয়ে ভয়-ডর শংকা। লেগেছে গ্রাম ও বাজারে আধুনিকতার ছোঁয়া। সন্ধ্যা হলেই কেরোসিন কুপির পরিবর্তে জ্বলে উঠে বৈদ্যুতিক আলো। সে আলোর ঝলকানিতে আলোকিত হয় চারদিক। এতকিছুর পরেও মানুষের মন থেকে একেবারেই যে বিষয়টা উবে গেছে তেমনটা নয়। রাত ৯ টার দোকান-পাট বন্ধ হলে ফের নির্জনতায় ডুবে যায় বাজার ও আশপাশের গ্রাম। আর এ নির্জতায় রাত গভীর হলে এখনো সে পথে যায় না মানুষ। মাঝে মধ্যেই কেউ কেউ শুনে থাকেন ভুতের মায়াবী কান্না, কখনো হি-হি-হা-হা অট্টহাসি।

