বিপজ্জনক ভূখণ্ড আর কতকাল বিপজ্জনক থাকবে?

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৫:৪০

ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের প্রচ্ছদে বছর দুয়েক আগে আঁকা হয় ছোট্ট দ্বীপ তাইওয়ানের ছবি। প্রচ্ছদ জুড়ে লেখা হয়, ‘তাইওয়ান একটি ছোট্ট দ্বীপ, যেখানে ২৪ মিলিয়ন লোক বসবাস করে।’ এতটুকু পর্যন্ত সবকিছু ঠিকই ছিল। তবে এর পরের অংশ বেশ ঘাবড়ে যাওয়ার মতোই—‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা হচ্ছে তাইওয়ান।’

তাইওয়ান যে পৃথিবীর বিপজ্জনক স্থান, এই দাবি নিয়ে সম্ভবত কারো দ্বিমত নেই। ফলে দ্য ইকোনমিস্টের প্রচ্ছদে তাইওয়ান নিয়ে উক্ত মন্তব্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। যা হোক, দুই বছর আগেকার সেই তাইওয়ান এখন আরো বেশি ‘বিপজ্জনক স্থান’ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শক্তিশালীও হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড।

‘তাইওয়ান’ প্রশ্নে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব নতুন কোনো সংবাদ নয়। আর এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পটভূমি অবশ্যই ‘ভূরাজনীতি’। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই যে ‘তাইওয়ান ইস্যু’ ঝুলে রয়েছে বছরের পর বছর, এ কথাও সঠিক। বিশেষত, প্রথমে চীনা নেতা শি জিনপিং, তারপর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের পর থেকে তাইওয়ানকে সব সময়ই টানটান উত্তেজনার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এই দ্বীপ ঘিরে বিপরীতমুখী কথা বলে আসছে আমেরিকা ও চীন উভয় দেশ। বরং তাদের কথাবার্তার ধরনেও আমূল পরিবর্তন লক্ষণীয়। পরস্পরের প্রতি মৌলিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তনও চোখে পড়ে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংকে সৌম্য থেকে শত্রুতার দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যেতে দেখে আসছি আমরা।

অনেকে বলতে চান, চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং অস্বাভাবিক ও দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আমেরিকার প্রভাবশালী অবস্থানের বাস্তবতাই চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব অনিবার্য করে তুলেছে। ক্রমবর্ধমান উদীয়মান শক্তি চীনের মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে প্রতিষ্ঠিত শক্তি আমেরিকা। এ ধরনের পরিস্থিতি সচরাচর যুদ্ধের অবতারণা ঘটায়। হার্ভার্ড আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক গ্রাহাম অ্যালিসনের মতো অনেক বিশ্লেষক এমনটাই মনে করেন। তবে এক্ষেত্রে হিসাব করে দেখতে হবে, এ দুই শক্তির মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা ঠিক কতটা।

মনে রাখতে হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সুসম্পর্ক নেই বটে। এমনকি ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ দুই দেশ। তবে একটা ক্ষেত্রে তারা ঠিকই এক কাতারে। আর তা হলো ‘অর্থনীতি’। কোনো সন্দেহ নেই, অর্থনৈতিকভাবে নিবিড় সম্পৃক্ত ওয়াশিংটন-বেইজিং।

আমেরিকার সঙ্গে যে চীনের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তা যে বেশ আগে থেকেই—এ বিষয়ে জানতে ফিরে যেতে হবে স্নায়ুযুদ্ধের যুগে। তখনকার দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাণিজ্যের শীর্ষে। পূর্ণ উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। সেই সময়কার অবস্থা বিবেচনায় এই পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন অবশ্যই উল্লেখ করার মতো।

মনে রাখা দরকার, সোভিয়েত জমানার সেই বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলারেই থেমে নেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য। বরং দুই দেশ সমপরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন করে থাকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই। অর্থাত্, এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। মজার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধ বাড়ানোর পরেও দুই দেশের বাণিজ্যে বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি। বাণিজ্যিক লেনদেন তো কমেইনি, বরং তা বাড়তির পথেই!

আমি মনে করি, চীনকে ‘একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উত্খাত করতে চাওয়া’ কিংবা ‘আমেরিকার বিকল্প মতাদর্শ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া’—এ ধরনের প্রবণতার বিষয়ে চীনকে অভিযুক্ত করা হয় বটে, কিন্তু এসবের বিচারে বেইজিংকে বিপ্লবী জাতি বলা সমীচীন নয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার সেই মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেহেতু এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না, তাই চীনকে নিয়ে ঢালাওভাবে মন্তব্য করা অনুচিত বলেই আমার অভিমত।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার মতো মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলেও একটা বিষয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বেশ সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। আমরা দেখে থাকি, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশই বিশাল অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে। এর ফলে একধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলে অন্য দেশের ওপর! সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে চীন, পাকিস্তান ও ভারত—সবার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটে ‘তাইওয়ান সমস্যা’ নিয়ে গভীর চিন্তার অবকাশ রয়েছে।

তাইওয়ানের স্বাধীন দেশ হতে চাওয়া যে চীন কখনোই মেনে নিতে চায় না, এর জন্য শি জিনপিংয়ের একার দোষ নয়। কারণ, এতে তার কোনো হাত নেই! বরং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সংবিধানেই তাইওয়ান নিয়ে এমনটা বলা আছে। মাও সেতুং থেকে শুরু করে প্রত্যেক চীনা নেতাই দুই ভূখণ্ড তথা চীন-তাইওয়ানকে একত্রিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে আসছেন।

একটা সময়ে কমিউনিস্ট চীনের বিশ্বাস ছিল, তাইওয়ানকে একীভূত করার প্রশ্নে ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ধারণা ছিল, বিপুল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে বিশাল অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠছে চীন, তাতে করে হয়তো কোনো একটা সময়ে এসে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়বে তাইওয়ান। তবে সেই আশার গুড়ে বালি! বিশাল ভূখণ্ডকে কখনোই পাত্তা দেয়নি ক্ষুদ্র দ্বীপের বেশির ভাগ বাসিন্দা। ফলে তাইয়ান ঘিরে চীনের যে ভাবনা ও পরিকল্পনা ছিল, তা অধরাই থেকে গেছে আজ অবধি।

ভুলে গেলে চলবে না, চীন ও তাইওয়ানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। একদিকে কমিউনিস্ট, অন্যদিকে বিকাশমান গণতন্ত্র—এমন এক পটভূমিতে দুই দেশের মিলন অনেকটা আকাশকুসুম চিন্তাই! বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গত কয়েক দশক ধরে চীনের সঙ্গে পুনর্মিলনের বিষয়ে এক পা-ও এগোয়নি তাইপে। বেইজিংয়ের সঙ্গে হাত না মেলাতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থেকেছে। প্রেসিডেন্ট শি এর মানে বোঝেন বেশ ভালোমতোই। আর সে কারণেই ‘তাইয়ান’ প্রশ্নে বেশ ভেবেচিন্তে পা ফেলছেন তিনিও।

তাইওয়ানের বেশির ভাগ মানুষ কী চায়, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, স্থিতাবস্থাই চান বেশির ভাগ নাগরিক। তাইওয়ানের সাম্প্রতিক নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এই নির্বাচনে স্বাধীন তাইওয়ানের পক্ষের রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এনেছে তাইওয়ানজিরা। যদিও বিজয়ী দল ভোট পেয়েছে কিছুটা কম—৪০ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ ভোটার অন্য প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন, যার মানে—স্বাধীনতা চান না এমন মানুষের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। সত্যি বলতে, এসবের মানে বুঝতে পারা বেশ জটিল!

যাহোক, বেইজিং ও ওয়াশিংটন উভয়েরই উচিত হবে তাইওয়ান ইস্যু খুব ঠান্ডা মাথায় দেখভাল করা। মাথায় রাখতে হবে, এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। একটু ভুল হলেই এই দ্বীপে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে! যদি কোনোভাবে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তাহলে মাশুল গুনতে হবে তিন পক্ষকেই। তাইওয়ান নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হলে তার বড় ভুক্তভোগী হবে গোটা বিশ্ব, যা আদৌ কাম্য নয়।

লেখক: সিএনএনের জিপিএস হোস্ট ও নিয়মিত কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এনএন