গণতন্ত্রের পথে রাশিয়া!

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩০

‘ছড়ায় দক্ষিণে বামে সৃজন প্রলয়;/ সে বিস্ময় সুখে দুঃখে গর্জি উঠি কয়—/ জয়, জয়, জয়।’ কথাগুলি শতবর্ষ পূর্বে লিখিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাহা এখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জন্যও প্রযোজ্য বটে। গত শুক্রবার শুরু হইয়াছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, চলিবে আজ রবিবার অবধি। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন—কী দরকার ছিল নির্বাচনের? একমেবাদ্বিতীয়ম ও অবিসংবাদিত নেতা পুতিন। একচ্ছত্র, অভাবিত, বিপুল বিস্ময়কর ক্ষমতা লইয়া তিনি ২৩ বত্সর ধরিয়া চূড়ান্ত ক্ষমতায় আসীন। তিনি যাহা বলিবেন, যাহা ভাবিতেন, যাহা চাহিবেন—রাশিয়ায় তাহাই হইবে। সুতরাং ভোট না হইলে কী আসিত যাইত! কিন্তু তাহার পরও তিনি তো ভোট বাদ দেন নাই। তিনি নির্বাচন দিয়াছেন, হউক তাহা একপেশে। তিনি ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বলিয়াছিলেন—২০২৪ সালের পরে আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে থাকিবেন না; কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত তিনি নিশ্চয়ই বদলাইতে পারেন। তাহা তিনি বদলাইয়াছেনও। সেই ২০০০ সালের মে মাস হইতে ২০০৮ সালের মে পর্যন্ত দুই দফায় ভোটে জিতিয়া তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন; কিন্তু তত্কালীন রুশ আইন অনুযায়ী দুই বারের অধিক প্রেসিডেন্ট পদে থাকা যাইত না। সেই কারণে তিনি অনুগত দিমিত্রি মেদভেদেভকে প্রেসিডেন্ট করিয়া নিজে প্রধানমন্ত্রী হইয়াছিলেন। তখন রাশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীই হইয়া গেলেন শীর্ষক্ষমতাধর ব্যক্তি। ইহার পর ২০১২ সালে নির্বাচনে জিতিয়া পুনরায় ছয় বত্সরের জন্য প্রেসিডেন্ট হন পুতিন। পুনরায় নির্বাচিত হন ২০১৮ সালে। সুতরাং পুনরায় তিনি টানা দুই বার প্রেসিডেন্ট হইলেন। পুনরায় আইনি বাধা আসিল দুই বারের অধিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের; কিন্তু ২০০৮ সালের মতো এইবার আর রাখঢাক রাখিলেন না পুতিন; ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ লইতে তিনি ২০২১ সালেই আইন পরিবর্তন করিয়া ফেলিলেন। সুতরাং পঞ্চম বার (দ্বিতীয় মেয়াদে টানা তৃতীয় বার) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হইয়া তিনি যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকিবেন—তাহাতে কাহারো কোনো সন্দেহ নাই।

কেন সন্দেহ নাই? নির্বাচন শুরুর আগেই দেশের অধিকাংশ বিরোধী নেতাকে জেলবন্দি করিয়াছে পুতিনের প্রশাসন। তাহার বিপক্ষে মাত্র তিন জন প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াই করিবার অনুমতি দিয়াছে রাশিয়ার নির্বাচন কমিশন। তাহার মধ্যে নির্দলীয় প্রার্থী হিসাবে লড়িতেছেন পুতিন। তাহার দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি অবশ্য পূর্বেই জানাইয়াছে, রুশ প্রেসিডেন্টকে পূর্ণ সমর্থন দিবে তাহারা। ইহা ছাড়াও নির্বাচনে লড়িতেছেন লেনয়েড স্লাটস্কি ও ভ্লাদিস্লাভ দাভানকোভ। দুই জনের কেহই পুতিন-বিরোধী মন্তব্য করেন নাই কখনো। ইতিপূর্বে পুতিনের প্রধান প্রতিপক্ষ জেলবন্দি অ্যালেক্সেই নাভালনিকে নির্বাচনি লড়াই হইতে সরাইয়া দিয়াছিল রুশ প্রশাসন। পরে জেল হেফাজতেই নাভালনির মৃত্যু হয়। নাভালনির পরে বিরোধী মুখ হিসাবে যেই দুই জনের নাম উঠিয়া আসে তাহার মধ্যে একাতেরিনা দুনোত্সভা মনোনয়ন দিলেও তাহার নথিপত্রে ত্রুটির অভিযোগ দেখাইয়া খারিজ করিয়া দেয় নির্বাচন কমিশন। অপর জন বরিস নাদেঝিন নির্বাচনে লড়িতে চাহিয়া ১ লক্ষ সই সংগ্রহ করেন; কিন্তু তাহার মধ্যে ৫ হাজার সইকে অবৈধ বলিয়াছে নির্বাচন কমিশন। ফলে দুই জনের কেহই নির্বাচনে লড়িতে পারিবেন না। সুতরাং পুতিনের জয় সুনিশ্চিত। টানা ২৪ বত্সর ক্রেমলিনে ক্ষমতায় ছিলেন জোসেফ স্তালিন এবং লিওনিদ ব্রেজনেভ। এই বার মস্কোর মসদনে বসিয়া নূতন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে যাইতেছেন পুতিন।

পুতিন সম্প্রতি বলিয়াছেন—আক্রান্ত হইলে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করিতেও দ্বিধা করিবেন না। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিয়াছেন—সেই পৃথিবী থাকিয়া কী লাভ, যেই পৃথিবীতে রাশিয়া থাকিবে না! আসলে সোভিয়েত জমানায় গুপ্তচর সংস্থা কেজিবির সাবেক প্রধান ভ্লাদিমির পুতিনের ইচ্ছাই যেন আইন। এখন রাশিয়ার আর জারতন্ত্র নাই, সোভিয়েততন্ত্রও ইতিহাসে বিলীন। এখন আছে পুতিনতন্ত্র। বলা যায়, এক বিমূঢ়-বিস্ময় জাগাইয়াছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন! কারণ, সংবিধানে ‘গণতন্ত্র’ থাকিলেও ‘পুতিনতন্ত্র’ সেই ‘গণতন্ত্র’কে গলাধাক্কা দেয় নাই। এখনো রাশিয়ার জনগণের ম্যান্ডেট লইয়াই পুতিন পুনর্বার প্রেসিডেন্ট হইতে যাইতেছেন। ইহা তো কম কথা নহে!

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন