গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি ক্রমশই বাড়িতেছে

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩০

শাসনতন্ত্র হিসাবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ‘সাম্যবাদ’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুইটি যেমন মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, তেমনি একুশ শতকে আসিয়া বৈশ্বিক রাজনীতির উঠানে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত ও জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। বিশ্বব্যাপী বক্তৃতা, বিবৃতি, পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিদিন গণতন্ত্র শব্দটির ব্যবহার হয় সহস্রাধিক বার। অবশ্য ইহার যথার্থ কারণও রহিয়াছে। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমাদের সামনে যতগুলো শাসনতন্ত্র বা নিয়মতন্ত্র রহিয়াছে তাহার মধ্যে গণতন্ত্রকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচনা করা হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনসাধারণের সক্রিয় ভূমিকা থাকিবার কারণে স্বচ্ছতার মানদণ্ডে গণতন্ত্র যতটা ফলপ্রসূ, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে ইহা ততটাই দুর্বল। কারণ এইখানে ম্যানিপুলেশন বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ রহিয়াছে। যে কোনো উপায়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিয়া রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে তাহাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা গণতন্ত্রের প্রতি হুমকিস্বরূপ। আর এই হুমকি ক্রমশই বিস্তার লাভ করিতেছে।

ইহার সহিত দরিদ্রতা ও নিরক্ষরতা যেইখানে বিদ্যমান, সেইখানে গণতন্ত্র সবচাইতে অধিক দুর্বল। ইহার কারণে উন্নত বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে গণতন্ত্রের এমন খারাপ অবস্থা দেখা যাইতেছে। এই সমস্ত দেশে ক্ষমতার গদিতে আসন গ্রহণ করিবার জন্য কতিপয় নেতা দরিদ্র ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর ভোট প্রদানের সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালান এবং অনেকাংশে সফলও হন। জনসাধারণের অভিমত পরিবর্তনের এই সমস্যা এতদিন উন্নয়নশীল দেশসমূহেই লক্ষ করা যাইত; কিন্তু এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় কার্যক্ষমতার কারণে উন্নত বিশ্বেও জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিয়া তাহাদের মতামত পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। গত সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গণতন্ত্র সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক দেশের প্রেসিডেন্ট উইন সুক ইয়েল বলিয়াছেন—‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া তৈরি ভুয়া খবর ও অপতথ্য গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে।’ উন্নয়নশীল দেশসমূহে, যেইখানে ইতিমধ্যে গণতন্ত্রের করুণ অবস্থা লক্ষ করা যায়, সেইখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন অপব্যবহার আরও মারাত্মক সমস্যা তৈরি করিতে পারে।

উক্ত সম্মেলনে উপস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেন, ‘ইতিমধ্যে স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ক্ষুণ্ন করিবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করিয়াছে।’ তাই ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শ টিকাইয়া রাখিবার জন্য এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদেরকে নিশ্চিত করিতে হইবে। গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ বিদ্যমান অন্যান্য বিষয়ের সহিত ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন আরও শক্তিশালীরূপে আবির্ভূত না হয়, সেই ব্যাপারে আমাদের এখনই সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। প্রযুক্তিগত হুমকি নিবারণ করিয়া, এই প্রযুক্তিকেই কীভাবে গণতন্ত্র ও সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রসারে কাজে লাগানো যায়, তাহার অনুসন্ধানই আমাদের লক্ষ্য হউক।  

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন