জনপ্রিয়দের অবসাদ এবং অতঃপর

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪, ২৩:২২

পৃথিবীতে প্রথম আত্মহত্যা কে করেছিলো সেটা সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় খৃিষ্টপূর্ব ৪৩৪ খৃষ্টাব্দে এম্পেদোক্লেস প্রথম আত্মহত্যা করেছিলেন। তার ধারণা ছিলো মৃত্যু এক রূপান্তর। সিসিলিয় পর্বতের এক আগ্নয়গিরিতে ঝাপ দিয়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন  করেছিলেন। রূপান্তরের ধারণা তাকে আত্মহত্যায় অনুপ্রাণিত করেছিলো। সব ধর্মেই আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাচীন কালে এথেন্সে যদি কেউ আত্মহত্যা করতো তাহলে তার কবর সাধারণ সমাধিস্থলে দেয়া হতোনা। এমনকি স্মৃতিফলক ব্যবহার পর্যন্ত  তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।

ইদানীং লক্ষ্য করা যায় প্রায়ই তারকারা খ্যাতি, যশ কিংবা সম্মান থাকা সত্ত্বেও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে ক্রমবর্ধমান সামাজিক পরিবর্তন, নাগরিক জীবনের চাপ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে অমিল, আত্মকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা, বৈশ্বিক অর্থ মন্দা, ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব এ বিষয়গুলি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাবক হিসাবে কাজ করে আর শিল্পী সত্ত্বাও এর বাইরে কোন আলাদা জগতের বাসিন্দা নন।

সৃষ্টিশীল মানুষেরা মননে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকেন। এই সংবেদনশীলতা তাদের প্রচণ্ড অনুভূতিপ্রবণ করে তোলে এবং তারা খুব সহজেই অবসাদ বা দুশ্চিন্তায় নিজেদেরকে আবৃত করে ফেলেন।

বেশিরভাগ শিল্পীরাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকেন।  তারা নিজেদের ভাবনাগুলো সব সময় খোলা মনে অন্যদের সাথে প্রকাশ করেন না। কখনো কখনো বাড়তি এই মানসিক চাপ মানসিক অবসাদে রূপ নেয় আর তারই বহিঃপ্রকাশ অনেকাংশে হয় আত্মহননে।

প্রতিভাময় সৃষ্টিশীল মানুষেরা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু সৃষ্টি করে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখতে চান। ক্রমাগত নতুন সৃষ্টির তৃষ্ণা  তাদেরকে সারাক্ষণ একটি মানসিক চাপে রাখে।

যখন প্রত্যাশা পূরণ হয়না তখন নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয় নিজেকে মূল্যহীন মনে হয় এবং তাদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়।

এছাড়াও তারকারা তাদের কাজের মাধ্যমে সব সময় আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। মিডিয়ার এই আগ্রাসনের যুগে এখন এ ব্যাপারটায় অসুস্থ প্রতিযোগিতাও বেশ প্রকট যা অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চাকে ব্যাহত করে এবং প্রকৃত শিল্পীদের হতাশাকে তারান্বিত করে ।

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার বেশিরভাগ  শাখাগুলোয় অর্থনৈতিক প্রাপ্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় বেশিরভাগ শিল্পীরাই বাস্তবিক জীবনে    আর্থিক টানাপোড়নে শেষ জীবন কাটান এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

নতুন শিল্পীদের আগমনে বয়স্ক শিল্পীদের আগের মতো কদর হয়না, তখন পুরোনোদের মধ্যেও  নিরাপত্তাহীনতা বোধ তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে অনেকের মাঝেই নিম্নমুখী ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতায় প্রচণ্ড অবসাদ তৈরি করে।

এছাড়াও তারকাদের জীবন সাধারণ মানুষের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, টাইম লাইন মিট করা, দুরে যাতায়াত, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, জনসমক্ষে নিজের খেয়াল খুশি মতো চলতে না পারা তাদেরকে বদ্ধ একটি রুটিনমাফিক জীবনের মধ্যে আবদ্ধ করে তোলে। অনেকে দীর্ঘদিনের এই চাপ সহ্য করতে না পেরে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন, অথবা মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

প্রতিটা শিল্পী তাদের কর্মের মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতি আশা করেন। সময় মতো কর্মের সঠিক মূল্যায়ন না হলে তারা হতাশ হন। এই হতাশা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থকলে তা একসময় মানসিক অবসাদে নিজেকে মূল্যহীন মনে হয় আর শেষ পরিণতি হয় আত্মহনন। আত্মহত্যা অবশ্যই চিকিত্সা বিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি মানসিক রোগ যার কারণ অবসাদ, হতাশা, সিজোফ্রেনিয়া এবং ব্যাক্তিত্ব বৈকল্য হলেও এটা একাধিক জটিল ঘটনা এবং কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং যা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনন্য।

তবে চিকিত্সা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অন্যরকম কিছু  ব্যাখ্যাও রয়েছে। আত্মহত্যা প্রবনতা যেসব মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় তাদের প্রথম থেকেই কিছু আচরণে বা কথাবার্তায় কোন না কোন সতর্ক বার্তা পাওয়া যায়। আত্মহণকারী নব্বই ভাগ মানুষই কোন না কোন মানসিক রোগে ভুগে থাকেন। তবে পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে আবেগ তাড়িত হয়েও অনেকে এই পদক্ষেপ নিতে পারেন।

আত্মহত্যার বিষয়ে অনেক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ভ্রান্ত ধারনা সমাজে প্রচলিত আছে। এ বিষয়ে আমাদের সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে  নাগরিক দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে।

লেখক :জনস্বাস্থ্য ও মনোচিকিৎসক

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন