উপজেলা নির্বাচন

জামানতের অঙ্ক পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না?

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৪, ০৫:৩০

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি দেশের স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের অতি নিকটে পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্যই স্থানীয় সরকার গড়িয়া তোলা হয়। বাংলাদেশে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, গ্রাম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, ছোট শহর এলাকায় পৌরসভা ও বড় শহরে সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারের যেই কাঠামো বিদ্যমান, তাহার উদ্ভব ঘটিয়াছিল সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।

তবে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন ও পরিমার্জনের ফলে আজকের দিনে প্রচলিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গঠন, কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সহিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের ধারণার বেশ তফাত রহিয়াছে। গণতন্ত্রায়ন ও উন্নয়নের স্বার্থে এখনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ তাহাদের ব্যবস্থাপনা, কার্য ও দায়িত্বের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন সাধন করিয়া থাকে, যাহা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আগামী ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন সম্মুখে রাখিয়া নির্বাচন কমিশন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালায় যেই পরিবর্তন আনিয়াছে, তাহা জনসাধারণের গণতন্ত্র চর্চায় কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করিবে, সেইটা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিশেষত, জামানতের পরিমাণ ১০ গুণ বৃদ্ধি করায় গণতন্ত্রকে গুটি কয়েক বিত্তশালী মানুষের গণ্ডিতে আবদ্ধ করিবার আশঙ্কা তৈরি হইয়াছে।

ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হইবার জন্য জামানতের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা হইতে বাড়াইয়া বর্তমানে ১ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করিয়াছে নির্বাচন কমিশন। ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামানত ঠিক করা হইয়াছে ৭৮ হাজার টাকা, যাহা পূর্বে ছিল মাত্র ৫ হাজার টাকা। ইহা ছাড়া নির্বাচন কমিশন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হইবার ক্ষেত্রে যেই বিধান ছিল তাহা শিথিল করিয়াছে। পূর্বে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হইবার জন্য ২৫০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের তালিকা জমা দিতে হইত। এই বিধান বাদ দিয়া প্রজ্ঞাপন জারি করিয়াছে নির্বাচন কমিশন। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করিলে ইহার ফলাফল কী হইতে পারে, তাহা পরিষ্কার বুঝা যায়। জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হইবার যেই সুযোগ ছিল, তাহা এখন বন্ধ হইয়া যাইতেছে। বাংলাদেশের মতো মধ্য আয়ের দেশে উপজেলা পর্যায়ে বিত্তশালী মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নহে। সেইখানে ১ লক্ষ টাকা জামানত দিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবার মতো সত্ ও জনদরদি মানুষ তেমন খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে কি না, তাহা লইয়া সন্দেহ রহিয়াছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ময়দানে সাধারণ জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন অসত্ ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাইবার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।

পূর্বে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হইবার জন্য একটা নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের তালিকা জমা দেওয়ার বিধান ছিল। বর্তমানে এই বিধান বাদ দেওয়ার ফলে কোনো সমর্থন ছাড়াই বিত্তশালীদের টাকার জোরে প্রশাসনের সহিত  যোগসাজশ করিয়া নির্বাচনে জয়লাভ করিবার সুযোগ তৈরি হইয়াছে। ইহাতে তাহারা রাজনীতিকে আরো অবৈধ সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসাবে যে ব্যবহার করিবেন না, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? এইভাবে নির্বাচনে বিত্তবান প্রার্থীরই  জয়জয়কার দেখা দিবে এবং যাহাদের জন্য এই নির্বাচন ও গণতন্ত্র—সেই জনগণেরই পরাজয় ঘটিবে বহুলাংশে।

স্থানীয় সরকার ধারণার উত্থানই হইয়াছিল কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রশাসনের সহিত জনগণের দূরত্ব ঘুচাইবার জন্য। সাধারণ জনগণের মধ্য হইতেই যদি জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের রাস্তা বন্ধ হইয়া যায়, তাহা হইলে সরকার ও জনসাধারণের দূরত্ব বাড়িবে বই কমিবে না। সুতরাং গণতন্ত্রের প্রসার ও প্রয়োগ নিশ্চিত করিতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামানতের অঙ্ক কমানো যায় কি না, তাহা বিবেচনা করিয়া দেখা উচিত। কেননা সত্ ও যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাইলে চূড়ান্তভাবে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন