ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘দেশ ভালো হয়, যদি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো হয়’। কথিত আছে, উচ্চশিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ডের মতো, অর্থাত্ এটি দেশকে শক্তিশালী ও সফল করতে সহায়তা করে। উচ্চশিক্ষার মূল ধারক ও বাহক হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৮টি পাবলিক ও ১১২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের অধিভুক্ত কলেজে প্রায় ৪৮ লক্ষ শিক্ষার্থী রয়েছে। এ বিশ্বায়িত বিশ্বে, আমরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংযুক্ত এবং তাদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার তুলনা করা স্বাভাবিক।
আমরা যখন সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ের দিকে তাকাই, তখন দেখি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তেমন ভালো করছে না। অতীতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই র্যাংকিংগুলোকে গুরুত্ব দিত না, কিন্তু এখন আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি না। উচ্চশিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে কি না, এটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। অনুমান করা হয়, ভবিষ্যত্ বিশ্ব হবে আরো জটিল, অনিশ্চিত, চ্যালেঞ্জিং, প্রযুক্তিনির্ভর ও সংঘাতপূর্ণ। বৈশ্বিক ও স্থানীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য আমাদের একুশ শতকের দক্ষতাসহ শিক্ষার্থীদের বিকাশ করতে হবে।
আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের মন পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা অন্যান্য দেশ থেকে প্রযুক্তি নিয়ে আসছি, কিন্তু আমরা আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নত করছি না কিংবা নতুন ধারণা নিয়ে আসছি না। এখনো আমাদের কোনো ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ২০২৩ বৈশ্বিক জ্ঞানসূচকে ১৩৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ খুবই কম নম্বর পেয়ে একেবারে শেষের কাতারে থাকা দেশগুলোর স্থানে আছে (১১২তম)। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ লক্ষ করা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ এক. পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান ও শেখনপদ্ধতি আপডেট/আধুনিকীকরণ ঘাটতি :আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেই কোনো আমূল পরিবর্তন। শিক্ষা অর্জনের সঙ্গে প্রায়োগিক দিকের সম্পর্ক না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অনেক ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এসব কারণে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন, উদ্ভাবনী ও গভীরতম চিন্তাভাবনাকারী, সমস্যা সমাধান করার মতো দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ কম তৈরি হচ্ছে।
দুই. শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এখন দলে দলে বিভক্ত। তার মানে অবশ্যই এটা নয় যে, ছাত্র-শিক্ষকরা রাজনীতিবিমুখ বা রাজনীতি বিষয়ে অসচেতন থাকবেন। রাষ্ট্র যখন আছে তখন রাজনীতি থাকবেই, থাকাটা অপরিহার্য ও অনিবার্য। আপত্তির জায়গাটা হচ্ছে, দলাদলিতে দলীয় স্বার্থের প্রতি অন্ধ থেকে তাত্ত্বিক ও আদর্শিক জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা। তিন. শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পদোন্নতি পেতে পিএইচডি ডিগ্রিসহ আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব বণ্টন ও পরীক্ষক নিয়োগ (শিক্ষার্থী মূল্যায়ন) ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিষয়গুলো প্রভাব ফেলছে। চার. মাতৃভাষার দুরবস্থা :বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সব শাখায়ই শিক্ষার্থীর বাংলা ও ইংরেজি এ দুটি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ইংরেজির জন্য মনোযোগ থাকলেও এক্ষেত্রে বাংলার অবস্থা খুবই শোচনীয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজির ব্যবহার আরো বেশি হয়ে থাকে। যদিও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির মান নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আসার পর, হঠাত্ করেই উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করতে বাধ্য হলেও, তাদের আত্মস্থ করা, চিন্তা করা ও মনে রাখার প্রক্রিয়াটি বাংলাতেই হয়ে থাকে। এতে শিক্ষার্থীরা না শিখছে বাংলা না ইংরেজি।
স্বাধীনতার পর দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম বাংলা করা হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ আমরা কমই দেখতে পাই। অথচ প্রচলিত শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সব ডিগ্রি কোর্স পর্যায়ে ১০০ নম্বরের ইংরেজি বিষয় সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অনেকে এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বলেন, উচ্চশিক্ষায় বাংলায় ভালো কোনো বইপত্র পাওয়া যায় না। কিছু বইপত্র পাওয়া গেলেও তা দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক নয়।
এছাড়া অনেকে বলেন, বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারের অপ্রতুলতার জন্য বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভ করা সম্ভব নয়। মাতৃভাষার গুরুত্ব যে দেশের নাগরিকদের কাছে যত বেশি, সে দেশ উন্নয়নের ধারায় তত বেশি অগ্রশীল। বর্তমানে চীন, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ। পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে অন্যদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার অব্যশই মাথায় রাখতে হবে। যেহেতু সারা বিশ্বে ইংরেজি ভাষার প্রচলনই সবচেয়ে বেশি এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে তারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেহেতু একটি ভালো চাকরি, কর্মসংস্থান যা-ই বলি না কেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ওপর।
কিন্তু আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না—সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে যখন কোনো জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বিসর্জন দেয়, তখন তারা তাদের নিজস্ব জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলে। পাঁচ. পাবলিক প্রাইভেট পার্টনার ঘাটতি :বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাদের জনসাধারণের উপলব্ধি উন্নত করার জন্য কাজ করতে হবে এবং তারা সমাজকে যে মূল্য প্রদান করে, তা দেখাতে হবে। উচ্চশিক্ষায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের দিকে জোর দেওয়া উচিত। বিদেশে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটা কোলাবরেশন থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের এ জায়গাটায় ঘাটতি আছে।
এ কোলাবরেশনে ঘাটতি থাকার কারণ কী? গেইন (GAIN) বলে একটা বিষয় আছে। গেইন হলো গ্র্যাজুয়েট একাডেমি ইন্ডাস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্ক। এখানে তিনটা পার্টই আছে। প্রথমটি ছাত্র, দ্বিতীয়টি ফ্যাকাল্টি ও তৃতীয়টি ইন্ডাস্ট্রি। এ তিনের সমন্বয়ে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। ছয়. তহবিলের অভাব :অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট কাটছাঁটের সম্মুখীন হচ্ছে, কিছু প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে; এর ফলে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। সাত. অ্যাক্সেস ও সামর্থ্যের অপ্রতুলতা :উচ্চশিক্ষায় যে ধরনের মৌলিক বই-পুস্তক, জার্নাল প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদেরও চিন্তাধারা, দক্ষতা ও মেধার বিকাশ ঘটাতে সহায়ক, তার সঙ্গে আমাদের সিংহভাগ শিক্ষার্থীর পরিচয় প্রায় ঘটেই না। তাছাড়া টিউশন খরচ বাড়তে থাকায় শিক্ষার্থীরা (বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আট. অনিশ্চিত চাকরির বাজার :চাকরির বাজার ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান আহরণ না করে বহুমাত্রিক জ্ঞান/দক্ষতা অর্জন ও প্রায়োগিক জ্ঞানের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে চাকরির বাজারে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা উচিত। নয়. গবেষণার জন্য তহবিল হ্রাস পাচ্ছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দশ. ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট :বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের জন্য তাদের দক্ষতা ও জ্ঞান ক্রমাগত বৃদ্ধি করার সুযোগ প্রদান করতে হবে। উচ্চমানের শিক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক উচ্চমানের শিক্ষক। যারা এত বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করেছেন, তারা ভালো মানের শিক্ষক পাবেন কোথায়, সেটা কি কখনো ভেবেছেন? শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য প্রচুর পরিমাণে প্রশিক্ষণ এবং সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের জরুরি পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য। এগারো. আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভাব :আন্তর্জাতিক ছাত্রদের সংখ্যা দিনদিন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, এর কারণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিতে হবে। বারো. আজীবন শিক্ষা :নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে, মানুষকে আজীবন শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে কখনো বয়সের ফ্রেমে বাঁধা উচিত নয়। তাই সব বয়সের মানুষ যাতে সারা জীবন ধরে শেখা চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সব বয়সের মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উচিত। তেরো. আমাদের দেশে স্টুডেন্ট লোন নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষার্থীদের লোন পাওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করা উচিত।
যদিও উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব না, তথাপি কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ প্রথমটি হচ্ছে, শিক্ষকের বেতন-ভাতা ও গবেষণার জন্য এমন অর্থ বরাদ্দ করা, যাতে তাকে নিত্যদিনের ডাল-নুনের হিসাব কষতে না হয় এবং শিক্ষা ও গবেষণার জন্য তারা সম্পূর্ণ নিবেদিত হতে পারেন। পরিশেষে বলা যায় যে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের উচ্চশিক্ষার অর্জন ততটা নয়, যতটা জাতি আশা করেছিল। বিশ্বায়নের এই যুগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করতে হবে।
লেখক :অধ্যাপক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনরি ও অ্যানিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়

