উন্নয়নশীল বিশ্বে সচরাচর সমস্যার অন্ত থাকে না। বিশেষত যেই সকল দেশ শত বত্সরের গণ্ডি পার করিতে পারে নাই তথা অপেক্ষাকৃত নবীন রাষ্ট্র, সেই সকল দেশে বহু ক্ষেত্রেই যেন একশ্রেণির-গোষ্ঠীর রামরাজত্ব তৈরি হইয়া যায়। তাহাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই সমস্যার স্তূপ চাপিয়া বসে রাষ্ট্রের ঘাড়ে এবং যাহার ফল শেষ পর্যন্ত জনগণকেই ভোগ করিতে হয়। রাষ্ট্রকে তাহারা মাস্তানি, চাঁদাবাজি, অন্যায়-অপরাধ, দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত করিয়া তোলে। অবস্থা এতটাই বেগতিক, অস্বস্তিকর পর্যায়ে চলিয়া যায় যে, তাহা ঘুম কাড়িয়া লয় মানুষের। লুটপাট, অর্থ তছরূপ উন্নয়নশীল দেশে যেন মামুলি বিষয়! কারণে-অকারণে কথার বাণে জর্জরিত করিবার পাশাপাশি রাজনীতিবিদদের একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপাইবার প্রতিযোগিতাও এইখানে নিত্যদিনকার চিত্র। ইহার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সর্বত্র অব্যবস্থাপনার চিত্রই প্রকটভাবে চোখে পড়ে। ইহা হইতে উত্তরণের পথও যেন সংকুচিত করিয়া দেওয়া হয়।
অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাইবে, এইখানে দরিদ্র লোকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়িতেছে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তাহাদের অবস্থা যেমন ছিল, এখনো অনেকের অবস্থার ইতরবিশেষ পরির্বতন হয় নাই। সময় গড়াইয়াছে বেশ খানিকটা, তথাপি তাহাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটে নাই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। এখনো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রকোপে হা-হুতাশ করা বন্ধ হয় নাই অনেক দেশের মানুষের। সিন্ডিকেট করিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হয়। অসাধু ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর কবজায় থাকা দেশের বাজারে পণ্যমূল্য উঠানামা করে তাহাদের খেয়ালখুশিমতো। ইহার শেষ কোথায়? একশ্রেণির লোকের অপকর্ম এবং অবাধ চুরিচামারির কারণেই যে এইরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহা বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন হইল, উন্নয়নশীল বিশ্ব যাহাদের কারণে ক্রমশ খাদের কিনারায় নামিতেছে, কাহারা সেই গোষ্ঠী?
আমরা যদি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে লক্ষ করি, তাহা হইলে দেখিতে পাইব, এই সকল স্থানেও প্রকাশ্যে ‘চুরি’ হইতেছে। বহু জায়গাতেই চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আধাসামন্তবাদের মতো রাজত্ব করিতেছেন। নিজেদের মতো সাজাইয়া লইতেছেন সকল কিছু, নিজেদের প্রয়োজন ও ইচ্ছাই যেন তাহাদের আইন। টেন্ডার ও পার্সেজ হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন খাতে জনগণের অর্থ লুটপাট করিতেছে। ইহা দেখিবারও যেন কেউ নাই! তাহাদের অপকর্মকৃত অর্থের যেন একটি নির্দিষ্ট ভাগ যে স্থানীয় সরকারি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের পকেটেও যায়। কোথাও কোথাও জেলার শীর্ষ সরকারি আমলাও আর্থিক লেনদেনে জড়াইয়া পড়েন। এইভাবে রক্ষকের দায়িত্বে থাকা কেহ যদি ভক্ষক হয় তাহা হইলে প্রতিকারের পথটুকুও বন্ধ হইয়া যায়। যেইহেতু প্রতিকারের পথ বন্ধ হইয়া যায়, সুতরাং উন্নয়নশীল বিশ্বে দুর্ভোগের সিলসিলার ইতি ঘটে না।
অনেক জনপদেই দুর্নীতি বাড়িতেছে হুহু করিয়া। ব্যাংকে লুটপাট চলিতেছে। বিদেশি ঋণের ভারে জর্জরিত হইতেছে দেশ। অথচ একটি পক্ষ ঠিকই ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিতেছে। সর্বত্র যেন তাহাদেরই দৌরাত্ম্য। তাহাদের বেহায়াপনার কারণেই যে দেশ ও জাতির প্রভূত ক্ষতিসাধন হইতেছে। কাহার নিকট প্রতিকার চাইবে সাধারণ জনগণ? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়া যাহারা রাষ্ট্রেরই শিকড় কাটিতেছে, তাহাদের পর্দা ফাঁস হইবে কীভাবে? কিন্তু নির্দিষ্ট দলের নহে, এই চিত্র প্রায় সকল দলের সকল জমানাতেই দেখা যায়। পুলিশ-প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষপর্যায়ের কোনো কোনো নেতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও মদতে একটি বিশেষ গোষ্ঠী অন্যায়-অপরাধ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার যে পরিবেশ তৈরি করে উন্নয়নশীল বিশ্বে, তাহার কি প্রতিকার হইবে না?
