সুপেয় পানির সংকট ও জলবায়ু বিপর্যয়

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩০

গরম বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তীব্র হচ্ছে নিরাপদ খাওয়ার পানির সংকট। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ওয়াসার গাড়ি থেকে পানি নিচ্ছেন মানুষ, এই চিত্র এখন ঢাকার অনেক এলাকায়। গরম বাড়তে থাকার পাশাপাশি এই সংকট আরো বাড়তে থাকবে। অনেকে ভাবতে পারেন, শহর বলেই পানির সমস্যা প্রকট দেখা যাচ্ছে, গ্রামের দিকে হয়তো এটা এত তীব্র নয়। আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলি। নিরাপদ পানি সম্পর্কিত এক প্রকল্পের কাজে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আশপাশের পুকুর থেকে খাবার পানিসহ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত পানি সংগ্রহ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় ঐ অঞ্চলের নলকূপের পানিসহ সব উেসর পানিই অত্যন্ত লবণাক্ত। এই লবণাক্ত ও পানের অযোগ্য পানি কেবল তারা নিজেরা পান করছেন এমন নয়, যদি বাইরে থেকে কোনো মেহমান সেখানে বেড়াতে যান, তাহলে তাদেরও ঐ পানি পরিবেশন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

অবশ্য কেবল বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বই এখন নিরাপদ খাবার পানির সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের ঋতু পরিবর্তিত হচ্ছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিরাপদ ও সুপেয় পানির ওপর। এ বছর প্রকাশিত ইউনিসেফের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০০১-২০১৮ সালে হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশই পানি সম্পর্কিত, অর্থাত্ খরা (অনাবৃষ্টি) ও বন্যা (অতিবৃষ্টি)। আর এ কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের শিশুরা। অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিনজনিত রোগে প্রতিদিন বিশ্বে প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে পাঁচ জন মৃত্যুবরণ করছে। ফলে এই বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ‘সকলের জন্য পানি ও পয়োনিষ্কাশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে ষষ্ঠ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশনের পর্যাপ্ততা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু সূচক নির্দিষ্ট করেছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে রয়েছে—সবার জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন নিশ্চিত করা, পানির দূষণ কমানো, পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা, গুণমান উন্নত করা, ঘাটতি মোকাবিলায় দক্ষতার সঙ্গে পানি ব্যবহার করা, খাল-বিল, নদী, ঝরনা বা হ্রদের মতো পানির প্রাকৃতিক উত্সগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া, পানি সংগ্রহ ও বিশুদ্ধ করা এবং দক্ষতার সঙ্গে পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং এসব ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মতো আরো নানা বিষয়।

ইউএন ওয়াটারের ২০২২ সালের দেওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের মাত্র ৫৯ শতাংশ মানুষ নিরাপদ উত্স থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছেন, যা ২০০৮ সালে ছিল ৫৫ শতাংশ। একই সঙ্গে, উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ রয়েছেন, ২০০৮ সালে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৫৫ শতাংশ।

২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রেস রিপোর্ট’ থেকে দেখা যায়, উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগকারীর সংখ্যা শূন্য ভাগে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয় সরকার; ১৯৯০ সালেও এই সংখ্যাটি ৩৪ শতাংশে ছিল। পুকুর-ডোবা, খাল-বিল, নদীসহ পানির উত্সকে নিরাপদ করা ও সামগ্রিকভাবে হাইজিন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের এই সাফল্য দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পায়। এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ষষ্ঠ লক্ষ্যপূরণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে রয়েছে—সব স্কুলে ওয়াশ (ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন) সুবিধা নিশ্চিত করা, শহরের বস্তি এলাকায় ওয়াশ সুবিধা ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, কমিউনিটি-লেড টোটাল স্যানিটেশন, নেশনওয়াইড স্যানিটেশন ক্যাম্পেইন ইত্যাদি।

বাংলাদেশ সরকার আগামী ১০০ বছরের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশলের রূপরেখা হিসেবে বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান ২১০০ (বিডিপি ২১০০) গ্রহণ করেছে। অভিযোজিত কৌশল বাস্তবায়ন করা ও দীর্ঘ মেয়াদে বিস্তৃত পানি সম্পদ খাত জুড়ে প্রশাসনকে শক্তিশালী করাই হলো এই বিডিপি ২১০০-এর লক্ষ্য। দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ করে নারী, শিশু ও সুবিধাবঞ্চিতদের ওয়াশ সুবিধার আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সহযোগী উন্নয়ন সংস্থাগুলো। যেমন—রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিলেটের ২১টি চা-বাগানে সুপেয় পানি ও উপযুক্ত টয়লেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে ওয়াটারএইড, ‘মিউনিসিপাল ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট ২০১৯’-এর মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ মানুষের সুবিধার্থে এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে টয়লেট নির্মাণে সহযোগিতা করেছে ইউনিসেফ, ইউকেএইড ও দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে); বস্তিতে এডিবির (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) অর্থায়নে পানির সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ঢাকা ওয়াসা। পাশাপাশি, সরকারের ‘কমিউনিটি-লেড টোটাল স্যানিটেশন’ উদ্যোগ প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ওয়াটারএইড। একই সঙ্গে, ‘সেইফ ওয়াটার ফর অল’ প্রকল্প গ্রহণ করে ব্র্যাক এবং সাজিদা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত হয় স্থানীয় ক্লিনিকে পরিচ্ছন্ন পানি নিশ্চিতে কমিউনিটি-কেন্দ্রিক প্রকল্প।

নিরাপদ ও সুপেয় পানি নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পিছিয়ে নেই। এসডিজির লক্ষ্য পূরণে ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যেমন বলা যায়, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদ পানি বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নারীদের ‘ওয়াটার হিরোজ’ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ইউনিলিভার। বিএটি বাংলাদেশ তাদের কৃষক সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ খাবার পানির প্রকল্প পরিচালনা করছে, যা তাদেরকে আর্সেনিক, আয়রন ও লবণাক্ততাজনিত কারণে দূষিত পানির কবল থেকে রক্ষা করছে। এছাড়াও, আমরা সর্বোত্তম নানা অনুশীলনী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুসরণ করার মাধ্যমে এসডিজি লক্ষ্যপূরণে ভূমিকা রাখছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ও কারখানার অপারেশন সাইটে ৩৫.৮ শতাংশ পানি পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেদের কারখানায় পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বমান নিশ্চিত করার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে বাংলাদেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম বারের মতো অ্যালায়েন্স ফর ওয়াটার স্টুয়ার্ডশিপ (এডব্লিউএস) কোর সার্টিফিকেট অর্জন করে বিএটি বাংলাদেশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে নিরাপদ ও সুপেয় পানির এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, সহযোগী উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা। আমাদের ছোট ছোট অভ্যাস ও সহানুভূতিশীল আচরণ নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টাকে আরো গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমরা পানির অপচয় কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হতে পারি, প্রয়োজন অনুযায়ী পানির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। একই সঙ্গে, আমরা চাইলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি। যেমন—পানির অপচয় রোধ ও পরিমিত ব্যবহারে আশপাশের মানুষকে সচেতন করে তোলা, পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা, ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষা করতে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিশ্বে নিরাপদ ও সুপেয় পানি অপ্রতুল; তার ওপর বিশ্বের প্রতি ১০ জন মানুষের এক জনই নিরাপদ ও সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত।  তাই আমাদের উচিত পানির মতো প্রয়োজনীয় উপাদানকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত জায়গা থেকে নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি আমার কাজটুকু ঠিকমতো করছি তো? 

লেখক: এরিয়া হেড অব বিজনেস, কমিউনিকেশন অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি (বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা), বিএটি

ইত্তেফাক/এমএএম