মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেন আর নেই

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৪, ০০:৫২

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, 'ভাসান পানি আন্দোলন'-এর নেতা নজির হোসেন ইন্তেকাল করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) ভোরে রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও ছেলেসহ অসংখ্য স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। তার মৃত্যু সংবাদে সুনামগঞ্জ জেলা তথা রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।

তার অনুজ বিশিষ্ট কবি ও লেখক  ইকবাল হোসেন কাগজী জানান, নজির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকার উত্তরার বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের শাহপুর গ্রামে।

এক সময়ের আলোচিত ও জনপ্রিয় এই বাম নেতা বিভিন্ন  আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।ছাত্রাবস্থায় নজির হোসেন ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করে কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে সিলেট জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন। ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

৬৯ সালের শেষের দিকে সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির দায়িত্ব লাভ করে  সুনামগঞ্জ মহকুমার গোপন কমিউনিস্ট সেলের প্রধান হন  নজির হোসেন ৷ তিনি ১৯৭১ সুনামগঞ্জ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সহসম্পাদক নিযুক্ত হন ৷ নজির হোসেনের উদ্যোগে টেকেরঘাট গেরিলা জোনটি গড়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে জুনের প্রথম দিকে শিলং এর সানী হোটেলে কমরেড বরুণ রায়, পীর হাবিবুর রহমান, বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও সরদার লতিফের উপস্থিতিতে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের আলোকে টেকেরঘাট সাব সেক্টর একটি গেরিলা যুদ্ধের জোন হিসেবে গড়ে ওঠে।  সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত কমান্ডার ও নজির হোসেন টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৪ সালে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে ১৮ মাসব্যাপী পড়াশোনার জন্যে মস্কোতে ছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি চারবছর আত্মগোপনে ছিলেন এবং মোশ্তাক সরকারের বিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধে সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ১৯৮৫ সালে নিরাপত্তা আইনে ৬ মাস কারাবরণ করেন।

সুনামগঞ্জের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নজির হোসেন ১৫ দলীয় জোটের নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন।  সুনামগঞ্জে জেলেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভাসান পানির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিপিবি থেকে ৮ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হয়ে নজির হোসেন প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন। তিনি পঞ্চম সংসদের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

আশির দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রাইকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনেও এর প্রভাব পড়ে। নব্বই দশকের প্রথম দিকে সিপিবি ভাঙ্গতে শুরু করলে মূলদল থেকে গণফোরাম, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দলে সিপিবি'র নেতাকর্মীরা যোগ দিতে শুরু করেন। তখন নজির হোসেন ১৯৯৩ সালের ১৫ অক্টোবর বিএনপিতে যোগ দেন। পরে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি নির্বাচিত হন। পদাধিকারবলে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। বিএনপিতে দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে গণমানুষের নেতা হিসেবে ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ৮ম সংসদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।

বৃহস্পতিবার  বিকালে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় প্রথম জানাজা এবং বিকেল সাড়ে ৫টায় গ্রামের বাড়ি জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শাহপুর গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নজির হোসেনকে। সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল হুদা মুকুট, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. শাখাওয়াত হোসেন জীবন, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি কলিম উদ্দিন মিলন, পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিন, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান পীর, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক আসাদুজ্জামান সেন্টু, জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মল্লিক মইনুদ্দিন সুহেল, সেলিম আহমদ, নাদির আহমদ, রেজাউল হক, আবুল মনসুর মোহাম্মদ শওকত, অ্যাডভোকেট শেরেনূর আলী, ফারুক আহমদ, আনসার উদ্দিন, আনিসুল হক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহিম শাহীন, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূরুল মোমেন সহ বিভিন্ন পেশার লোকজন জানাজায় অংশ নেন।

 

ইত্তেফাক/এসটিএম