মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হুইলচেয়ার কই?

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ০৫:৩০

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। দাঁড়িয়ে আছি হাসপাতালের ভেতরে। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। রোগীর চাপ কিছুটা কম। এসেছি সন্তানসম্ভবা বড় বোনকে নিয়ে। সরকারি হাসপাতালে এলেই নানা রকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে কেউ যদি উপন্যাস বা গল্প লিখতে চান, তাহলে এ জায়গা হতে পারে একটি অসাধারণ স্থান। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের চরম মুহূর্তগুলোর সন্ধান পাওয়া যায় এখানে। যাই হোক, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সেবা পাওয়া সবসময়ই একটি ভালো অনুভূতি তৈরি করে। যেমন আমার বোনের ডাক্তার দেখানোর জন্য সেদিন খরচ হয়েছে মাত্র ১০ টাকা। আর একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফের জন্য ১১০ টাকা ও সিবিসির (রক্ত পরীক্ষা) জন্য ১৫০ টাকা। এত কম খরচে সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদই বটে। কিন্তু, এই আশীর্বাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন সব ঘটনা এখানে ঘটে, যা মাঝে-মাঝে নির্মম কৌতুক বলেই মনে হয়। তবুও, গরিব মানুষের শেষ ভরসা এই হাসপাতালগুলোই। আমার এ লেখা এমন এক কৌতুকের ঘটনা নিয়েই।

আমার বোনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পর ডাক্তার তাকে হাঁটতে বারণ করলেন। হুইলচেয়ারে করে হাসপাতালে চলাচল করতে বললেন। হুইলচেয়ার, স্ট্রেচার হাসপাতালে ঢোকার সময়ই দেখে এসেছি জরুরি বিভাগের সামনে। ওয়ার্ডেও নিশ্চয় থাকবে। সামনে দাঁড়ানো আনসার সদস্যকে বলি, ‘ভাই, হুইলচেয়ার কই?’

‘এই ওয়ার্ডে নাই, ঐ ওয়ার্ডে যান।’

ঐ ওয়ার্ডে যাই। নার্সকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপা, হুইলচেয়ার কই?’

‘আমরা কই পাব! কোনো আয়াকে বলেন।’

চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে আয়াকে খুঁজতে থাকি। অসুস্থ রোগীকে রেখেই ওয়ার্ড থেকে ওয়ার্ডে ঘুরি। এক ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা পেলাম কাঙ্ক্ষিত আয়ার। তিনি বললেন—আছে হুইলচেয়ার! আমি বললাম, একটু দ্রুত চলুন, রোগী একা আছে।

‘চলেন বললেই তো হইলো না, টাকা লাগবো হুইলচেয়ারের লাইগা।’

টাকা কেন? সরকারি হাসপাতালে তো এ সেবা বিনা মূল্যেই পাওয়া যায় বলেই জানি। কিন্তু তখন তর্কাতর্কির সময় নেই। রোগীকে নিতে হবে। কত টাকা লাগবে? এবার শুরু হলো আরো মজার (করুণ) ঘটনা। মনে হলো, আমি যেন চলে এসেছি মাছের বাজারে। বলা যায়, রোগীর বাজারে। এ বাজারে ক্রেতা রোগী, বিক্রেতা হাসপাতালের কর্মচারীগণ। একজন বলেন ৩০০ টাকা তো আরেকজন ২০০ টাকা। তিন তলা থেকে নিচ তলা নামতে ২০০-৩০০ টাকা লাগবে! তাও আবার লিফটে করেই। মাথা বনবন করতে থাকে। ছুটে যাই নিচে, জরুরি বিভাগের সামনে। সেখানে স্তূপ করা আছে হুইলচেয়ার। সেখানে নিশ্চয় সহজে পাওয়া যাবে। কিন্তু না। প্রতিটি হুইলচেয়ার, স্ট্রেচার দখল করে আছেন একজন করে কর্মী। টাকা ছাড়া কেউ এগুলো ছাড়বেন না। দরাদরি করে টাকা ঠিক হলেই তারা হুইলচেয়ার সঙ্গে নিয়ে আসবেন রোগীকে বহন করতে। অবশেষে ৫০ টাকায় একজন রাজি হলেন। ডাক্তার দেখাতে যেখানে আমাদের খরচ হয়েছে ১০ টাকা, সেখানে ডাক্তারখানা থেকে পরীক্ষা করার জায়গায় যাওয়া, পরীক্ষা করে ডাক্তার দেখিয়ে আবার নিচে নামতে কেবল হুইলচেয়ারেই লেগেছে ২০০ টাকা!

এসব শেষে বাসায় যাওয়ার জন্য মূল ফটকের সামনে এসে দেখি ৫-৬টি হুইলচেয়ার। প্রত্যেকটির ‘মালিক’ সঙ্গে রয়েছেন। কেউ কেউ সেই হুইলচেয়ারেই বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন ক্রেতার জন্য। একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা থামল। ছুটে গেল হুইলচেয়ার। তুলতে পারলেই টাকা! চোখ চকচক করছে বিক্রেতার। এমন সময়ই আরেকটি পরিবার নেমে এলো উপর তলা থেকে। হুইল চেয়ারে বসা তার অসুস্থ সন্তান। শিশুটির মা ১০০ টাকার একটি নোট হুইলচেয়ারের মালিককে দিতেই ছুড়ে ফেলে দিলেন তিনি। সেই মা টাকা তুলে হুইলচেয়ার মালিকের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করছেন। এর বেশি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও মন গলছে না মালিকের। তার ‘নিজস্ব সমপদ’—হুইলচেয়ারে ঠায় বসে আছে সে। যেন মনে হচ্ছে, কোনো এক অভিমানী শিশু বসে আছে তার খেলনাগাড়িতে।

এসব দৃশ্যের নীরব দর্শক আমি। বাসায় যাওয়ার সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে মোহাম্মদপুরের ভেতরের এলাকা ভাড়া ঠিক করলাম ১৫০ টাকা। ভাবছি ভাড়া গাড়ির ব্যবসার চেয়েও হুইলচেয়ারের ব্যবসা কতটা লাভজনক! যেখানে গাড়ির চালকের কয়েক কিলোমিটারে মিলবে ১৫০ টাকা, সেখানে লিফটে করে নিচ তলা থেকে দোতলা-তিনতলায় উঠলেই মিলবে তারও বেশি।

আমি নিতান্তই সাধারণ একজন নাগরিক। আমার দেখা ঘটনার পেছনে কারা রয়েছেন, এর জাল কত দূর বিস্তৃত, তার কিছুই আমার জানা নেই। আমি সাংবাদিক নই। তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে যাইনি আমি। তথ্যসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজ তোলা রইল কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত মহলের জন্য। আমার ও আমার পরিবারের কেবল একটিই চাওয়া, স্বল্পমূল্যে সরকারি সেবা যেন সবাই নির্বিঘ্নে ভোগ করতে পারে।

মিরপুর, ঢাকা

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন