নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা কেবল প্রকৃতির রুদ্ররূপই দেখায় নাই, উন্মোচিত করিয়াছে মানুষের ভিতরকার অন্ধকার দিকও। বন্যায় নিহত এক নারীর মৃতদেহ হইতে অলংকার খুলিয়া লইবার একটি দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইয়া পড়িবার পর নিন্দার ঝড় উঠিয়াছে। দুর্যোগের সময় এমন ঘটনা অবশ্য নূতন নহে। কোথাও বিপন্ন মানুষের ঘরবাড়িতে লুটপাট, কোথাও-বা উদ্ধারের পরিবর্তে বিপদগ্রস্ত মানুষের ছবি তুলিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইবার প্রতিযোগিতা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তামাশা দেখিবার প্রবণতা সমাজ-জীবনের প্রচলিত ছবি। এইরূপ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক-বিপদের মুহূর্তে 'মানুষের ভিতরের মানবিকতা' বা মানবিক সংযম কোথায় হারাইয়া যায়? সভ্যতার সব চাইতে বড় পরিচয় প্রকাশ পায় বিপদের সময়ে। সুদিনে সহানুভূতিশীল হওয়া সহজ, কিন্তু দুর্দিনে অপরের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া এক কঠিন পরীক্ষা। বর্তমান সময় কি আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিতেছে?
এই রকম নিষ্ঠুরতা এখন আর নেহাত দুর্যোগের দৃশ্য নহে, বরং পরিণত হইতেছে সমাজ-জীবনের নিত্যচিত্রে। পারিবারিক বিরোধে আপনজনের উপর হামলা হইতেছে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া ঘটিতেছে প্রাণঘাতী সংঘাত, দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলিয়া লওয়ার ঘটনা বাড়িতেছে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হইতেছে অপমান-বিদ্বেষ। ইহার সার্বিক ফলাফলে যেন মানুষের সহনশীলতার দেওয়ালটিই ক্রমশ ভাঙিয়া পড়িতেছে। সম্প্রতি যশোরে পারিবারিক কলহের জের ধরিয়া বঁটি দিয়া কুঁপাইয়া মায়ের মাথা বিচ্ছিন্ন করিয়াছেন শিক্ষক ছেলে!
অনেকে বলিতে পারেন-যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষের মানসিক চাপ বাড়াইয়া দিতে পারে, ভবিষ্যৎ-অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়াইতে পারে। এই দাবি অমূলক নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই কারণে সহিংসতা প্রতিরোধে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও বৈষম্য কমানোর নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছে। তবে সংকটকাল নিষ্ঠুরতা-বর্বরতার লাইসেন্স দেয় কি না, সেই প্রশ্নেরও অবকাশ থাকিয়া যায়। কারণ, সংকটের সময়ে দায়িত্ব বাড়ে বই কমে না। উন্নত সমাজগুলিতে আমরা ইহাই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। সেই সকল সমাজে সমস্যা বা সংকট ব্যবস্থাপনা কেবল উদ্ধার-কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং উহা একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সম্পদ সুরক্ষা, দুর্বল জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা প্রদান, জরুরি যোগাযোগ, দ্রুত বিচার প্রভৃতি সকল কিছুর সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হইয়া উঠে। ফলে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের সুযোগ লইয়া অপরাধ সংঘটনের পথ খোলা থাকে না। আমাদের সমাজেও অনুরূপ সহমর্মিতা, আত্মসংযম ও নাগরিক দায়িত্বের সংস্কৃতি জোরদার করা প্রয়োজন। সকলের মনে রাখা দরকার, আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু বিবেক, মূল্যবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের 'কৃত্রিম যন্ত্র' বসাইয়া দিতে পারে না। মানুষের ভিতরের হিংস্রতাকে নির্মূল করিতে প্রয়োজন মূল্যবোধের শিক্ষা।
ইতিহাসে বহুবার যুদ্ধ আসিয়াছে, দুর্ভিক্ষ আসিয়াছে, মহামারি ও অর্থনৈতিক মন্দা আসিয়াছে; আবার সেই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়াইয়াই সভ্যতা আগাইয়া গিয়াছে সামনের দিকে। অর্থাৎ, সংকট বা সমস্যা কখনোই স্থায়ী নহে; বরং সংকটের সময়ে মানুষ কেমন আচরণ করে, তাহাই সেই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করিয়া দেয়। আর সেই জন্য আজিকার অস্থির সময়ে সবচাইতে অধিক যেই জিনিসটির প্রয়োজন, উহা হইল 'ধৈর্য ধারণ'। ক্রোধের পরিবর্তে সংযম, প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য এবং লোভের পরিবর্তে মানবিকতা-অস্তিত্বের প্রশ্নে ইহাই আজ সমাজের জন্য অধিক জরুরি। মহান আল্লাহ তায়ালা বিপদের সময় ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়াছেন। সুতরাং, দুর্যোগ যত বড়ই হউক, মানুষের ভিতরের মানুষটিকে যেন তাহা গ্রাস করিতে না পারে, সেই ব্যাপারে সজাগ থাকিতে হইবে। দুর্যোগ ঘর ভাসাইতে পারে, যুদ্ধ শহর ধ্বংস করিতে পারে, অর্থনৈতিক সংকট জীবন কঠিন করিয়া তুলিতে পারে, কিন্তু মানুষ যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই ভুলিয়া যায়, তাহা হইলে সেই সমাজকে ধ্বংস করিবার জন্য আর কোনো দুর্যোগের প্রয়োজন হইবে কি?

