গত ২১ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশ ও দলের প্রতি অঙ্গীকার, সততা, নীতি ও আদর্শ—এ সব কিছু মিলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব নতুন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার পেছনে পড়ে আছে দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথ, আদোলন- সংগ্রাম, জেল-জুলুম, মামলা-হামলার ইতিহাস। পৌরসভার চেয়ারম্যান দিয়ে শুরু। এরপর সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং সবশেষ রাষ্ট্রপতি— বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নজীর তেমন একটা নেই।
জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতেখড়ি হয়েছিল মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। বিএনপির চেয়ারম্যান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে ভ্রসা রেখেছেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদটি দীর্ঘদিন পর তার মর্যাদা ফিরে পেয়েছে।
সংগ্রাম, ত্যাগ তিতীক্ষা, সততা ও আদর্শকে আশ্রয় করলে তৃণমূল পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতা যে রাষ্ট্রের কাণ্ডারি হতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সুদীর্ঘ চার দশকের রাজনীতির পথ পরিক্রমা শেষে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ আগস্ট। মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামমুখর ও ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা প্রাসঙ্গিক হবে বিধায় এখানে তার কিছুটা উল্লেখ করা যেতে পারে । ছাত্রজীবনের রাজনীতির শুরুর এক পর্যায়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে যোগ দেন শিক্ষকতায়। মির্জা ফখরুল দিনাজপুর ও ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন।
ভাসানীর ন্যাপ দিয়ে রাজনীতি শুরু হলেও পরে যোগ দেন বিএনপিতি। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এক পর্যায়ে দলের চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহসচিব করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ টানা ১০ বছর তিনি বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের মহাসচিব ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে দলের মনোনয়নে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । বিএনপির ২০০১-২০০৮ মেয়াদের সরকারের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। সবশেষ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে স্থানীয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনে তিনি ছিলেন দলের প্রথম কাতারের একজন লড়াকু নেতা। বার বার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গিয়েছেন। মিথ্যা মামলায় আসমি হয়েছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফ্যাসিবাদী আমলে ১১১টি মামলায় ১১ বার কারাগারে গিয়েছেন । অসুস্থ শরীর নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শেখ হাসিনার সাজানো মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠালে সেই সংকটময় সময়ে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় তখন দল পরিচালিত হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাসিত, দলের জন্য সেই সময়টা ছিল দুঃসময় ও রীতিমতো চ্যালেঞ্জের। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাও ছিল কঠিন পরীক্ষার বিষয়। হাজার হাজার কর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। শুধু কর্মী নয়, বিএনপির প্রায় সব শ্রেণির কেন্দ্রীয় নেতার নামে অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়। বাদ যাননি দলের নীতিনির্ধারকরাও। এক মামলায় জামিন হয়, তো আরেক মামলা দিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয়। অনেক নেতাকর্মী বাড়িঘর ছাড়া হন। কেউ কেউ রাতে ঘুমানোর জন্য কবরস্থান এবং নদীর মাঝে নৌকায় আশ্রয় নেন। এমন এক পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুলও বার বার কারাগারে গিয়েছেন। কারাগারের বাইরে থাকলে আন্দোলন সংগ্রামে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন । দুঃসময়ে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন বলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুর্ণ আস্থা রেখেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ত্যাগ তিতীক্ষার মূল্যায়ন করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে দলের অনেক সিনিয়র, ত্যাগী ও যোগ্য নেতা থাকা সত্বেও সবদিক বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদটির জন্য প্রধানমন্ত্রী মির্জা ফখরুলকেই বেছে নেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম হলেন মূল ধারার জাতীয় নেতৃত্বের এক বহুমাত্রিক ও ধারাবাহিক বিবর্তনের প্রতিকৃতি । ছাত্রনেতা থেকে পেশাজীবী, তৃণমুল থেকে জাতীয় রাজনীতি। বিএনপির চরম সংকটকালে দলীয় সংহতি ধরে রেখে অভিভাবকত্ব করেন । দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপের মুখে তৃণমুল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। তিনি ছিলেন দলের প্রধান মুখপাত্র ও রাজপথের আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি। তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও তিনি তুলনামুলক সহনশীল প্রাঞ্জল ও মার্জিত ভাষার ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন।
১/১১ এর সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের প্রতি অনুগত থেকে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করেন । দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কারাদন্ড এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাসে অবস্থানকালীন সময়ে মির্জা ফখরুল তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের শীর্ষনেতাদের এক সুতোয় বেঁধে রাখতে সক্ষম হন। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও উস্কানিমূলক পদক্ষেপ না নিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধৈর্য প্রদর্শন করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম শুধু নিজ দলকেই ঐক্যবদ্ধ রাখেননি বরং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সাধারণ কর্মসূচির আওতায় ‘যুগপৎ আন্দোলন' গড়ে তুলতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের রাজনৈতিক দলসমুহকে একমঞ্চে বা একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা তার রাজনৈতিক কূটনীতির একটি বড় পরিচয়।
বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল কোনো চমক নয়, বরং এটিই প্রত্যাশিত ছিল। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম গত শুক্রবার বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করেন। রবিবার গার্ড অব অনার গ্রহণের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে প্রবশ করেন। বাংলাদেশের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী বঙ্গভবনই এখন মির্জা ফখরুলের ঠিকানা। আগামী পাঁচ বছর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে গুরুদায়িত্ব পালন করবেন রাজনীতির মাঠের সংগ্রামী নেতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী, সৎ ও সজ্জন মানুষ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের সংকটকালে কোনো অপশক্তির সঙ্গে আপস না করে সংবিধানের অর্পিত ক্ষমতাবলে দেশ ও মানুষের কল্যাণে অবিচল থাকবেন। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার গণ্ডি পেরিয়ে সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে জাতির প্রধান অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন । এটাই মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

