মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বান্দরবানে ৬০ ইটভাটায় পুড়ছে দৈনিক ২৪ হাজার মণ কাঠ

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৫:০০

বান্দরবান জেলায় মোট ৬০টি ইটভাটার কোনোটিতেই ইট পোড়ানোর লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের সার্টিফিকেট, আয়কর প্রত্যয়ন ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। সব ইটভাটা এক দশক ধরে অবৈধ। প্রভাবশালীদের মালিকানা ও ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে ও ফসলি জমির উর্বর মাটি দিয়ে ভাটাগুলো চলছে। ভাটাগুলোতে দিন-রাত বনের কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। কোনো ভাটাতে কয়লা ব্যবহার করা হয় না। ৬০টি ইটভাটার মধ্যে শুধু ফাইতং একটি ইউনিয়নে ২৮টি এবং বান্দরবান সদর উপজেলায় ১১টি ইটভাটা। কাঠ পোড়ানোর ফলে বন উজাড়ের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হচ্ছে। সব কয়টির চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। 

এদিকে অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে, লোকালয়ে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে ও উর্বর কৃষি জমিতে। অবৈধ ইটভাটার ভয়াবহ রকম হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। তিন ফসলি জমিও রক্ষা পাচ্ছে না। নষ্ট হচ্ছে ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ও ফলমূল। ইটভাটগুলো আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর হঠাৎ অভিযান চালিয়ে মামলা দায়ের সামান্য জরিমানা ও ইটভাটার আংশিক সাইট ভেঙে দেয়, তবে অদৃশ্য কারণে ইটভাটার চিমনি ভাঙা হয় না। জরিমানা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে অভিযান।

সরজমিনে দেখা গেছে জেলার ৬০টি ইটভাটাতে পাঁচ শতাধিক শিশু কাজ করছে। ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে জমির উর্বর মাটি। স্থানীয়রা জানায়, আর্থিকভাবে সাময়িক লাভবান হওয়ার আশায় অনেক কৃষক তাদের ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেক ইটভাটাতে ইটের সাইজও ছোট। বছরের পর বছর ভাটা থেকে ইট কিনে ঠকছেন ক্রেতা। ইটভাটার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি ইটভাটায় ইট পোড়াতে দৈনিক প্রায় ৪০০ মণ তাজা কাঠ প্রয়োজন। সে হিসেবে জেলার ৬০টি ভাটায় দৈনিক ২৪ হাজার মণ কাঠ বন বিভাগকে ম্যানেজ করে ইটভাটায় জ্বলছে। এভাবে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া বর্ষার শুরু পর্যন্ত জ্বলবে। 

ইটভাটার মালিকরা জানান, ইট প্রস্তুত মৌসুম শুরুর আগে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সকল প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করে থাকেন। এবারও তাই হয়েছে। তাদের মতে, পুরো মৌসুম ম্যানেজ করে চলছে সকল অবৈধ ইটভাটা। ফেব্রুয়ারি মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় তিনটি, মার্চ মাসে লামা উপজেলায় তিনটি অবৈধ ইটভাটা ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেঙে দিলে দুদিন পর বন্ধ হওয়া সেই ইটভাটাগুলো আবারও চালু হয়েছে। অবৈধ সব ইটভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকলেও সরকারি কোষাগারে ভূমি উন্নয়ন কর, ভ্যাট আদায় ঠিকই জমা হচ্ছে। ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ তে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ইট তৈরি করার সুযোগ নেই। লাইসেন্স ছাড়া কেউ ইটভাটা চালু করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বান্দরবানে এক দশক ধরে অবৈধভাবে চলা সকল ইটভাটা চালু থাকাতে এটাই প্রমাণিত যে, তারা  আইনের তোয়াক্কা না করে চালিয়ে যাচ্ছে ইটভাটার কাজ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ইটভাটাগুলো যাতে আর চালু না হতে পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট তৈরিতে উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিতে বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করবে সরকার। সব বায়ুদূষণকারী ও কৃষিজমির মাটি ক্ষয়কারী ইটভাটা বন্ধ করে আধুনিক পদ্ধতির ব্লক ইটের ব্যবহার পুরোপুরি চালু করতে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ইটভাটামালিকরা চাইলে সরকার থেকে প্যাকেজগুলো গ্রহণ  করে ব্লকের দিকে যেতে পারবেন।

জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন বলেন, বান্দরবানের একটি ইটভাটারও কোনো অনুমতি নেই। উচ্চ আদালতের ১০টি রায় আছে। প্রতিটি রায় ভিন্ন ভিন্ন। সরকারি উন্নয়ন কাজের জন্য ইটের প্রয়োজন। কিন্তু আদালতের নির্দেশ জেলায় কোনো ইটভাটা পরিচালনা করা যাবে না। তবে জেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন নিয়ে নতুন ইটভাটা স্থাপন করা যাবে। আগের ইটভাটা বন্ধ থাকবে। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানোর পরদিনই আবারও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চালু হয় ভাটা। প্রতিদিন তো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সম্ভব নয়। লোকবলেরও অভাব রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফখরউদ্দিন চৌধুরী বলেন, এক দশক ধরে অবৈধভাবে বান্দরবানের ইটভাটাগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে। চলতি বছরও ৬০টি ইটভাটার মধ্যে একটিরও সরকারি অনুমতি ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। তিনি আরো জানান, ২০১৯ সাল থেকে ২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত পাহাড় কাটা ও ইটভাটা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৫৩টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ২০১৩ সালে ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন হওয়ার পর বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় কোনো ইটভাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ইটভাটাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এর পরও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে চলছে।

ইত্তেফাক/এমএএম