মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

স্বাস্থ্যকর ও নির্ভেজাল ইফতারসামগ্রী

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০২:৩৮

খাদ্যে ভেজাল দেওয়া এই দেশের এক বিরাট সমস্যা। ইহার কারণে নানাভাবে জনস্বাস্থ্য পড়িয়াছে হুমকির মুখে। এই সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছে; কিন্তু তাহার কোনো স্থায়ী সমাধান হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। বরং গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্ট হইতে জানা যায়, বাজারে ইফতারিপণ্যেও ভেজাল দেওয়া হইতেছে। বিষয়টি অনেকের নিকট স্পর্শকাতর বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু ইহার বিরুদ্ধেও আমাদের প্রতিবাদ জারি রাখিতে হইবে। কেননা খোদ ইসলামের দৃষ্টিতেই খাদ্যে ও পণ্যে ভেজাল মিশানো জঘন্য অপরাধ। আমরা যদি পরিপূর্ণ মুসলিম হই, তাহা হইলে এই কাজ করিতে পারি না কিছুতেই। কেননা মহানবির (সা.) মহান বাণী অনুযায়ী প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যাহার মুখ ও হাত হইতে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকেন এবং মুমিন ঐ ব্যক্তি, যাহার পক্ষ হইতে অন্য মানুষের প্রাণ ও সম্পদের কোনো শঙ্কা না থাকে (বুখারি)।

আমরা দেখিতে পাইতেছি, ইফতারিপণ্য পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুনি, চপ, ছোলা, জিলাপি, নিমকপরা, পাকোড়াসহ যেই সকল ডুবাতৈলে ভাজা হইতেছে, তাহার তৈল অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের এবং একই তৈল বারংবার ব্যবহার করা হইতেছে, যাহা তৈরি করিতেছে ট্রান্সফ্যাট। এই ট্রান্সফ্যাট হার্টের রোগের অন্যতম কারণ। ইফতারির মুড়িতে ব্যবহার করা হইতেছে ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড, যাহাতে মুড়ির দানাগুলি বড় হয়। ইহাতে ব্যবহূত হইতেছে ইউরিয়া সার, যাহাতে ইহা অধিকতর সাদা হয়। এই সকল উপাদানের কারণে পেটে আলসার হয়, নষ্ট হয় রক্তের শ্বেতকণিকা ও হিমোগ্লোবিনের কার্যকারিতা। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখিতে তৈলের সহিত মিশানো হইতেছে মবিল। ইহাতে পেটের পীড়া, কিডনি ও যকৃতের সমস্যা তৈরি করিতেছে। বেগুনি, পিঁয়াজু ও চপে একশ্রেণির অবিবেচক বিক্রেতা ফুডকালারের পরিবর্তে ব্যবহার করিতেছে টেক্সটাইল কালার বা কাপড়ে ব্যবহূত রং। কেননা এক কেজি ফুডকালারের দাম যেইখানে প্রায় ১০ হাজার টাকা, সেইখানে টেক্সটাইল কালার মাত্র ৩০০ টাকায় কিনিতে পাওয়া যায়। যাহারা এই সকল ইফতারিতে ফুডকালার ব্যবহার না করিয়া টেক্সটাইল কালার ব্যবহারপূর্বক রোজাদারদের সর্বনাশ করিতেছে, তাহারা অবশ্যই আখিরাতে আল্লাহতায়ালার শাস্তির মুখোমুখি হইবে এবং ইহাকালেও তাহাদের পাকড়াও করা প্রয়োজন। কেননা ইহাতে কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হইতেছে। মিষ্টান্ন জাতীয় দ্রব্যে সোডিয়াম সাইক্লামেট নামক যে ভেজাল চিনি মিশানো হইতেছে, তাহাও ভয়াবহ ক্ষতিকর। আবার হালিমে উচ্ছিষ্ট মাংস ব্যবহারকারীরাও বড় অপরাধী।

মাহে রমজান হইল সিয়াম সাধনার মাস। রমজানের রোজা আমাদের আত্মসংযমের শিক্ষা প্রদান করিয়া থাকে; কিন্তু এই সময় দেখা যায়, আমরা গ্রাহকদের সহিত নানাভাবে প্রতারণার আশ্রয় লই। এই জন্য আমাদের সচেতনতার বিকল্প নাই। বাজারের বদলে যথাসম্ভব বাসার ইফতারের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াইতে হইবে। বাঙালি মুসলিম জাতি ইফতারসামগ্রীতে মাত্রাতিরিক্ত ভাজাপোড়ার সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিয়াছে, যাহা বিপজ্জনক। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের ইফতারসামগ্রীর প্রতি দৃষ্টি দিলেও বিষয়টি স্পষ্টত বুঝা যায়। তাহা ছাড়া মাহে রমজান হইল আত্মসংযম, ইবাদত ও দানখয়রাতের উত্তম মাস। এইখানে ভোগবাদিতার কোনো স্থান নাই।

তিরমিজি শরিফের এক হাদিস অনুযায়ী সত্ ও আমানতদার ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন নবি, সত্যবাদী ও শহিদদের সহিত থাকিবেন; কিন্তু ব্যবসায় সততা অবলম্বন না করিলে তাহাদের মহাপাপী বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে। একবার রাসুল (সা.) বাজারে এক খাদ্যস্তূপের নিকট গিয়া তাহার ভিতরে হাত প্রবেশ করাইয়া দেখিলেন, ভিতরের খাদ্যগুলি ভেজা। বিক্রেতা তাহা বৃষ্টিতে ভিজিয়া যাইবার অজুহাত তুলিলেও তিনি মানিয়া না লইয়া বলিলেন, যে ব্যক্তি প্রতারণা করিবে, সে আমার উম্মত নহে (সহিহ মুসলিম)। আজ আমরা খাদ্যে নানাভাবে ভেজাল ও কেমিক্যাল মিশ্রণ করিয়া গ্রাহকদের ঠকাইতেছি, এমনকি তাহাদের স্বাস্থ্যহানি করিতেছি। ইহার পর আমরা কীভাবে নিজেদের মুসলমান দাবি করিতে পারি? হারাম ভক্ষণকারীর ইবাদত কখনো কবুল হয় না। এই কথা জানিবার পরও কি আমরা ইফতারিপণ্যে ভেজাল মিশাইতে থাকিব?

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন