সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

তাহারা অনেকের জীবন দুর্বিষহ করিয়া তুলিতেছে!

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৩০

ক্ষমতা হইল সূর্যের আলোর ন্যায়। উহা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহা হইলে চারিপাশ আলোকিত হইয়া উঠিবে, দেশ ও দশের কল্যাণ হইবে। অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার ডাকিয়া আনিবে আর্তনাদ, হাহাকার। অযোগ্য-নষ্ট লোকের হাতে যদি কোনোভাবে ক্ষমতা চলিয়া আসে, তাহা হইলে কী যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হইতে পারে, তাহা আমরা লক্ষ করিতেছি স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে। তাহারা মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো মামলা দিয়া প্রতিপক্ষদের জীবনকে দুর্বিষহ করিয়া তুলিতেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এখনো অনেকে ঘরছাড়া। আর যাহারা গ্রেফতার হইয়াছে, কোর্টকাচারিতে মামলা পরিচালনা করিতে গিয়াই অনেকে নিঃস্ব হইয়া যাইতেছে। অর্থকড়ি না দিলে থানা হইতে ছাড়া পাওয়া কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দল বা প্রতিপক্ষ নেতাকর্মীর উপর যেইভাবে দমনপীড়ন চালানো হইতেছে, তাহাদের ধরপাকড় করা হইতেছে, মিথ্যা-বানোয়াট মামলা দিয়া জেলা পুরা হইতেছে কিংবা ঘরছাড়া-এলাকাছাড়া করা হইতেছে, তাহা কীসের আলামত? অনেক এলাকায় গ্রামগঞ্জে মাস্তানি-চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় চলিতেছে প্রায় বিনা বাধায়। এই সকল অন্যায়, অপকর্ম ও অপরাধের নাটের গুরু ঐ শ্রেণির মামলাবাজ নেতা। মনে রাখিতে হইবে, তাহাদের কোনো দল নাই, গোত্র নাই। তাহাদের অনেকে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, সমাজের বিনষ্টকারী। অথচ তাহারাই আজ নিজেদেরকে ‘সরকারি দলের লোক’ বলিয়া পরিচয় দিতেছে সদম্ভে। মানুষের জীবনকে যাহারা বিভীষিকাময় করিয়া তুলিতেছে, তাহারা সরকার বা সরকারি দলের অংশীদার হয় কী করিয়া?

বিভিন্ন নির্বাচনের সময় অন্য দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীর উপর একশ্রেণির উঠতি নেতা যেইভাবে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাইয়াছে, তাহা কি কোনো সুস্থ, সভ্য মানুষের কাজ হইতে পারে? যাহারা আজও ঘরবাড়ি ছাড়া, তাহাদের এবং তাহাদের পরিবারের কথা কি কেউ ভাবিতেছেন? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুস্থ রাজনীতি করিবার অধিকার সকলের আছে; কিন্তু রাজনীতি করিতে আসিয়া যদি নিজের ও পরিবারের মহাসর্বনাশ হইয়া যায়, তাহা হইলেও তো সুস্থ রাজনৈতিক চর্চায় নাম লিখাইতেই মানুষ ভয় পাইবে। নষ্ট রাজনীতির শিকার হইয়া যেই সকল নেতা ঘরছাড়া-স্বজনছাড়া হইয়াছেন, দুর্মূল্যের বাজারে তাহাদের পরিবার কী অবস্থায় দিনাতিপাত করিতেছে, তাহা কি দেখিবার কেহ নাই?

আমরা বারংবার বলিয়া আসিতেছি, এই সকল তথাকথিত নেতা স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতাসীন কোনো কোনো শীর্ষ রাজনীতিবিদ বা আমলার আশীর্বাদপুষ্ট। প্রশ্ন হইল, তাহারা কি এতটাই ক্ষমতাধর যে, তাহাদের থামাইবার মতো কোনো শক্তিই নাই? ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। পুলিশে ভালো, সত্ অফিসার নাই, ইহাও আমরা বিশ্বাস করিতে চাহি না। উপরন্তু বলিতে হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা। কোনো সন্দেহ নাই, তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ মানুষ। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা তিনি খুব ভালোমতোই সামলাইতেছেন। পুলিশের আইজিও অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি। ইহার পরও কি স্থানীয় পর্যায়ের একশ্রেণির নেতা-পাতিনেতাদের দৌরাত্ম্য থামিবে না?

আমরা আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ করিয়াছি, সাম্প্রতিক কালে অনেক এলাকায় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীর লোকজনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলা-হামলা দিয়া হয়রানি করা হইয়াছে। জেলজুলুম চালানো হইয়াছে। ভোটের মাঠ পরিষ্কার করিবার স্বার্থে তাহাদের জেল হইতে ছাড়া হইয়াছে নির্বাচনের পর! এই সকল বিষয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা আইজিপি জানেন না, তাহা হইতে পারে না। যদি ঐ সকল নামধারী নেতাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চিতভাবে আরো অধিক ক্ষমতাধর হইয়া উঠিতে চাহিবে, ক্ষমতাকে সুসংহত করিতে সকল কিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উন্মত্ত হইয়া উঠিবে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে আরো দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্য হইয়া উঠিতে পারে! তাহাদের কারণে সমাজে যে দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতেছে, ভুক্তভোগীরা যেইভাবে নিষ্পেষিত হইতেছে, তাহাতে রাজনীতি এবং পুলিশিং—এই দুইটি বিষয়ের প্রতিই মানুষ আস্থা হারাইয়া ফেলিতে পারে।

মনে রাখিতে হইবে, ক্ষমতাকে অনেকে নিজের লোভ-লালসা চরিতার্থ করা এবং নিজের আখের গুছাইবার কাজে ব্যবহার করে। তাহাদের অন্ধকার ও পরিত্যক্ত মনের ফাঁকা জায়গা আগাছা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ। অন্যায়-অপরাধ, দুষ্কর্ম ব্যতীত তাহাদের কাছে কীই-বা প্রত্যাশা করা যায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট দলের রাজনীতিকগণ এই বিষয়ে আন্তরিক দৃষ্টি দিবেন বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। দেশে যখন স্থিতিশীলতা ফিরিয়া আসিতেছে, তখন গুটিকতক লোকের কারণে যেন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বদনাম না হয়, সেই দিকেও দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন