মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পলিসি রেট এবং মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গ

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনধারণ খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক বছর আট মাস ধরে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপর রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তা খুব একটা কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়নি। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি একপর্যায়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ছিল বিগত ৪০ বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) দুই বছরের ব্যবধানে পলিসি রেট অন্তত ১৩ বার বৃদ্ধি করে। এছাড়া আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি পলিসি রেট বৃদ্ধি করে, তাহলে উদ্যোক্তা ও সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের মাঝে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস পায়। এতে বাজারে অর্থের জোগান কমে যায়। মানুষ চাইলেই আগের মতো অর্থ ব্যয় করে পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে পারে না। যদিও পলিসি রেট বাড়ালে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। আরো নানা ধরনের কার্যব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অধিকাংশ দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, আমরা অভ্যন্তরীণ বাজারে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো সাফল্য প্রদর্শন করতে পারছি না। বিশেষ করে, খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের দুর্দশা লাঘবের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। পুরো মন্ত্রিসভা এ ব্যাপারে কাজ করছে। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না। নতুন নতুন আইনকানুন তৈরি হচ্ছে কিন্তু তার পরও উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমছে না। দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা, যারা সাম্প্রতিক তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছিল, তাদের মূল্যস্ফীতির হার একসময় ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে তারা মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশ এখনো খাদ্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে পারেনি, অথচ বাংলাদেশ খাদ্যপণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রায় স্বনির্ভরতা অর্জনের কাছাকাছি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ মোট চাহিদাকৃত চালের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ আমদানি করে থাকে। অবশিষ্ট চাল স্থানীয়ভাবেই উত্পাদিত হয়। অন্য দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারলেও আমরা এক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য প্রদর্শন করতে পারছি না।

করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার-প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিপ্রবণতা শুরু হয়। যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ অতিক্রম করে গিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ অতিক্রম করে গিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর গড় মূল্যস্ফীতির ৯ শতাংশের ওপর চলে গিয়েছিল। কিন্তু নানা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এসব দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি? আমাদের দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য আমরা যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, তা সম্ভবত সঠিক ছিল না। অথবা সঠিক থাকলেও তার প্রয়োগ যথাযথ হয়নি। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতিসুদহার অন্তত ১৩ বার বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বেশ কয়েক বার পলিসি রেট বাড়িয়েছে। আগে পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। এখন তা সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক না করে কিছুদিন আগ পর্যন্তও ৯ শতাংশে সীমিত করে রাখা হয়। এর ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়। আগের এক মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ; অথচ ব্যাংক ঋণের বাস্তব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। তার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয়, তা উত্পাদনশীল খাতে ব্যবহূত না হয়ে অন্য খাতে চলে গেছে। এই ঋণের অর্থের একটি বড় অংশই নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারে চলে এসেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত না হয়ে বরং আরো বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতির নানা কারণ থাকলেও এর একটি বড় কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হালনাগাদ এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের অপ্রতুলতা। পণ্যের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যদি ভারসাম্য না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবেই। একটি পণ্য কতটা উত্পাদিত হলো আর বাজারে কতটা চাহিদা, তা জানাটা খুবই জরুরি। অনেক সময় কোনো কোনো মন্ত্রণালয় বা দপ্তর বাহ্বা নেওয়ার জন্য উত্পাদিত পণ্যের পরিমাণ বেশি প্রদর্শন করে। বিভিন্ন পণ্য উত্পাদন এবং জোগানের বিষয়ে আমরা যে তথ্য পাই, তা কতটা সঠিক, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একাধিক বার এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনা করেছি। সরকারি এক দপ্তরের সঙ্গে আর এক দপ্তরের দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো মিল থাকে না।

তথ্যবিভ্রাট লক্ষ করেছি বেকারসমস্যার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারের হার হচ্ছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থনীতির সূত্র মোতাবেক, কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশের নিচে বেকার থাকলে সেই দেশকে বেকারমুক্ত দেশ বলা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্যমতে, বেকারের হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে বেকারমুক্ত একটি দেশ। কিন্তু আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে যখন আমার এলাকায় যাই, তখন যদি ১০ জন মানুষ আমার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন, তাদের মধ্যে অন্তত ছয় জনই চাকরি প্রদানের জন্য অনুরোধ করেন। এটা আমি কোনোভাবেই মেলাতে পারি না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি বেকারমুক্ত একটি দেশ হয়, তাহলে এত লোক চাকরির জন্য তদবির করতে আসেন কেন? সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এখন আর শুধু তদবিরে চাকরি হয় না। চাকরির জন্য তদবিরের পাশাপাশি আরো অনেক কিছু প্রয়োজন হয়।

চাহিদা ও জোগানের মাধ্যমে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হবে। জোগান যদি স্বাভাবিক এবং চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, তাহলে বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ২৯টি সবজি জাতীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটা আমার নিকট খুব তাজ্জব মনে হয়েছে। কারণ বাজার মনিটরিং করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল এবং ম্যাকানিজম আমাদের নেই।

বিশ্বের যেসব দেশ ব্যাংকের পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তাদের দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সরকার নির্ধারণ করে দেয়। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারছে না। যেসব দেশে মানিটাইজেশনটা দুর্বল, সেই সব দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না। যারা ফিস্ক্যালিস্ট তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ফিস্ক্যাল পলিসি বেশি কার্যকর। আমি আমার থিসিস তৈরির সময় এই দুই মতের মধ্যে একধরনের সমঝোতা খুঁজে পেয়েছি। যেসব দেশে মার্কেট বেশি কার্যকর এবং ক্রিয়াশীল, ব্যাংক ইন্টারেস্ট রেটের ওপর সেই সব দেশে মনিটারি পলিসি ভালো কাজ করে। যেসব দেশে মনিটাইজেশন বা মনিটারি ইন্টারমিডিয়েশন প্রসেস দুর্বল, সেসব দেশে ইন্টারেস্ট রেট কম ইফেকটিভ, বরং সেখানে ফিস্ক্যাল পলিসি তুলনামূলক ভালো কাজ করে। আমাদের দেশে মানিটারি পলিসির চেয়ে ফিস্ক্যাল রেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশি কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সভাপতি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন