মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘এনআরবিসি ব্যাংকের কাছে গ্রাহকদের আমানত নিরাপদ’

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ২১:০৮

এনআরবিসি ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং জগতে প্রতিষ্ঠিত নাম। ২০১৩ সালে নতুন যে নয়টি ব্যাংক যাত্রা শুরু করে, ব্যাংকগুলোকে বলা হয় ‘চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক’। ব্যাংকিং সেবার উৎকর্ষ, নেটওয়ার্কের প্রসার এবং সেবা-পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণে দেশের আর্থিক খাতে একটি গ্রাহকবান্ধব আধুনিক এবং শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে আলোচিত এনআরবিসি ব্যাংক। বর্তমান সময়ে ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকদের ভীতি, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানসহ রেমিটেন্স পাঠাতে প্রবাসীদের নানা সুবিধা নিয়ে কথা বলেছেন এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল। সঙ্গে ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের হেড অব ডিজিটাল শরাফত হোসেন

প্রশ্ন: পারভেজ তমাল, ইত্তেফাক ডিজিটালের পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং আমরা জানি যে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে আপনারা আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। আপনারা বলছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের প্রজন্মের ব্যাংক থেকেও আপনারা আর্থিকভাবে ছাড়িয়ে গেছেন। এই সাফল্যের পেছনে গল্পটা শুনতে চাই? 

পারভেজ তমাল: ধন্যবাদ। দেখেন, প্রবাসীদের জন্য দেওয়া এই ব্যাংক। প্রবাসীরা যারা বাইরে কাজ করেছি আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের যে উন্নয়ন হচ্ছে, আমাদের দেশ আজকে যেখানে পৌঁছেছে সেটার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা থেকেই আমাদের এই ব্যাংকের পথচলা। এই চলার পথে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, বিশেষ করে আমি যখন আসলাম তখন প্রবাসীদের বোর্ড তৈরি হয় এবং প্রবাসীদের মধ্যে যে এক্সপেরিয়েন্সটা (অভিজ্ঞতা) ছিল সেই এক্সপেরিয়েন্স (অভিজ্ঞতা) দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি যে রুট লেভেলে (গ্রামীণ পর্যায়ে) বেশিসংখ্যক মানুষকে সেবার আওতায় আনা। এটাই ছিল আমাদের আসল উদ্দেশ্য।

‘আমরা প্রবাসীর স্বপ্ন’ আমাদের শ্লোগান। যারা প্রবাসী, এখানে উদ্যোক্তা তারা একদম সাধারণ ঘরের সন্তান এবং আমাদের ইচ্ছাটা ছিল যে প্রান্তিক জনগণকে আমাদের ব্যাংকিং সার্ভিসের আওতায় নিয়ে আসা। কারণ, সামগ্রিকভাবে প্রান্তিক জনগণ বাদ দিয়ে আসলে কোনো ডেভেলপমেন্ট (উন্নয়ন) হতে পারে না। প্রান্তিক জনগণের মধ্যে বিনিয়োগ পাওয়ার যে অভাবটা সেই জায়গাটায় আমরা কাজ করতে চেয়েছি। একদম রুট লেভেলে (গ্রামীণ পর্যায়ে) জামানতবিহীন লোন আমরা দিয়ে থাকি, বিনিয়োগ করি। সেই জায়গাটাতে সরকারের যত শ্লোগান আছে, গ্রামকে শহরায়ন করা এবং গ্রামের লোক যাতে শহরমুখী না হয় এবং গ্রামেই যাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় সেখানেই আমরা কাজ বেশি করছি।

এই জায়গায় কিন্তু অন্য একটা ব্যাপারও আছে। আমানতকারীর স্বার্থরক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। সেই জায়গাতে আমরা দেখেছি যে, প্রান্তিক জনগণের মধ্যে ঋণ ফেরত দেওয়ার টেন্ডেন্সিটা (প্রবণতা) অনেক বেশি। সেই জায়গায় আমরা একদম প্রান্তিক জনগণ, প্রথমে উত্তরাঞ্চল থেকে কাজ শুরু করেছি এবং এখন সারা বাংলাদেশে এই ঋণ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

এখন আমাদের যে স্ট্যাটিসটিকস, আমাদের কটেজ মাইক্রোতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে। এর বাইরে আমাদের যে কার্যক্রম সেটা হলো মানুষের যে দৈনন্দিন প্রয়োজন একটা ব্যাংকে তাদের যে সার্ভিসগুলো দরকার সেই সার্ভিসগুলো, সেই সেবাগুলো নিশ্চিত করছি। বিভিন্ন পল্লীবিদ্যুৎ বিল কালেকশন থেকে শুরু করে বিআরটিএ ল্যান্ড রেজিস্ট্রেশনের পেমেন্ট। যাতে খুব সহজে ব্যাংকের কাছে আসতে পারে সেই জায়গাগুলো আমরা কাজ করছি। এখন আমরা ১ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছি। 

প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করার কথা ছিল, ৫৩ জন উদ্যোক্তা ছিল। ৫৩ জনের মধ্যে হয়তোবা দুই-তিনজন এখন আমাদের সঙ্গে নেই। তারা তাদের শেয়ার বিক্রি করেছে এবং কিছু সমস্যা ছিল যে আমাদের অনেক উদ্যোক্তা আছে যারা এখনো বাংলাদেশি হয়েও গত ১০ বছরে একবারও আসেননি। এর ফলে আমরা চেষ্টা করেছি যে, আজকে ৫৩ জন উদ্যোক্তা দিয়ে আমরা এখন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, সাড়ে ১৭ হাজার শেয়ারহোল্ডার। আমরা সম্পৃক্ত হয়েছি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে এবং এখানে শুধু এখন প্রবাসী উদ্যোক্তা নয় বাংলাদেশে আমাদের শেয়ারহোল্ডার ১৭ হাজারের উপরে।

আমরা সবার ইচ্ছার প্রতিফলন এবং দেখেন যে আমাদের গত ৫ বছরের আমরা যে ডিভিডেন্ড দিয়েছি সেটা চতুর্থ প্রজন্মের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিভিডেন্ড দিতে পেরেছি। আবার অন্যদিকে আমাদের যে প্রফিটের অবস্থান এবং স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যে বিনিয়োগ ফেরত আনার জন্য যে প্রচেষ্টা সবগুলোই আমাদের চলমান।

প্রশ্ন: আপনাদের উপশাখা বর্তমানে কয়টি আছে? আপনারা তো বলছেন আপনারা উপশাখার প্রবর্তক, কেন? 

পারভেজ তমাল: আমরা যখন কাজ শুরু করেছি ২০১৮ সালের দিকে এসে দেখলাম বাস্তবতা। একটি শাখা করতে হলে প্রায় ১ কোটির উপরে খরচ হয়ে যায় এবং এটি নতুন ব্যাংকের উপর একটি বাড়তি বোঝা এবং আসলে এখান থেকে যে সার্ভিস গুলো নিশ্চিত করা দরকার রুরাল ডেভেলপমেন্ট এবং প্রান্তিক জনগণের জন্য। আসলে আমরা এখন সারা বিশ্বেই দেখছি যে, অফলাইন ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা আস্তে আস্তে ফুরিয়ে যাচ্ছে, ক্যাশলেস সোসাইটি হচ্ছে।

সেই জায়গা থেকে আমরা একদম নতুন কনসেপ্ট বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আমরা আলাপ করি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদেরকে প্রথমে দশটি উপশাখা করার অনুমোদন দেয়। এখন আমাদের প্রায় সাড়ে ৭০০ উপশাখা আছে। সেখান থেকে শুধু আমাদের ব্যাংক নয় আজকে প্রায় ২০টি ব্যাংকের উপশাখা কার্যক্রম চলছে।

সেই জায়গাতে আমরা অল্প খরচে আমাদের একদম ২০০ থেকে ১০০০ স্কয়ার ফুট পর্যন্ত উপশাখা আছে। যেখানে যে ধরনের সার্ভিসের জন্য যতটুকু প্রয়োজন হয়। একদম স্বল্প খরচে উপশাখা তৈরি করার জন্য কনসেপ্ট আমরা নিয়ে এসেছি। যেখানে ৫ লাখ টাকা খরচের মধ্যে আমাদের উপশাখা আছে আবার ১৫ লাখ টাকা খরচের মধ্যে উপশাখা আছে। অন্তত আমরা খরচ বাঁচিয়ে মানুষকে যেই সেবাটা দরকার সেই সেবা নিশ্চিত করার কাজগুলো উপশাখাতেই করছি। যার ফলে ১ কোটি গ্রাহককে আমরা সেবা দিতে পারছি।

প্রশ্ন: ছয় বছরে কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন বা আপনার সাফল্যের পেছনে যে চ্যালেঞ্জগুলো ছিল সেগুলো কী? এগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন? 

পারভেজ তমাল: এই ছয় বছরের প্রত্যেকটা সময়ই চ্যালেঞ্জ। কারণ, কঠিন সমযয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই জায়গাটা থেকে কিছু বেনামি লোন ছিল সেগুলো উদ্ধার করা এবং যে লোনগুলো ফেরত আসছে না সেগুলো নিয়ে নার্সিং করা। পরবর্তীতে আমরা কোভিডের মধ্যে পড়েছি এবং কোভিডের পরে যুদ্ধ পরিস্থিতি একটা সুযোগ তৈরি করে। কারণ, সব ব্যাংকগুলো ক্রাইসিসের মধ্যে পড়ে এবং এই জায়গাটাতেই আমরা বেশি কাজ করেছি।

কোভিডের মধ্যে আমাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং একদম রুরাল লেভেলে (গ্রামীণ পর্যায়ে) যারা ব্যাংকের সুবিধার আওতার বাইরে তাদের ওই সেগমেন্টের প্রতি আমরা বেশি ঝুঁকে পড়েছি। এটার কারণ হলো, কোভিড পরিস্থিতিতে আমরা দেখেছি যে লোয়ার লেভেলের ইকোনোমি যেটা বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে সেই জায়গায় আমরা বেশি বেশি ইনভেস্টমেন্টের কথা চিন্তা করছি এবং আজকে আমাদের প্রায়ই টোটাল পোর্টফলিওর ফিফটি পার্সেন্ট লোয়ার লেভেলের ইনভেস্টমেন্ট এবং রোরাল ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে কাজ করছে।

আমি মনে করি যে আমরা অনেক সুযোগ পেয়েছি এবং নতুন সেগমেন্টের কাজ করারও সুযোগ এই বাস্তবতার মধ্যে পেয়েছি এবং সেখান থেকে প্রফিট হচ্ছে। আমরা সবচেয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রফিটেবল ব্যাংক। অতএব, আমি মনে করি যে আমরা যে চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েছিলাম সেটা দিয়ে আমাদের যারা শেয়ারহোল্ডার আছে তারাও সুবিধাবঞ্চিত হয়নি।

প্রশ্ন: রেডজোনের তালিকাভুক্ত হচ্ছে অনেক ব্যাংক। ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সেটি প্রকাশ হয়েছে। এই ভীতি থেকে এনআরবিসি ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য আপনি কী বার্তা দেবেন?

পারভেজ তমাল: এটাও বলে রাখি যে, এনআরবিসি ব্যাংক এই ৯টি ব্যাংকের মধ্যে নেই সেটি একটি সুখবর এবং এগিয়ে যাচ্ছে। এরপরও অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি আছে। অনেক প্রবাসীকে দেখেছি যে ব্যাংকে টাকা রাখবে নাকি তুলে ফেলবেন। অনেকের মধ্যে আমরা সেই টাকা তোলার হিড়িক দেখেছি। 

এই জায়গায় আমার ব্যাংক সম্পর্কে বলতে চাই, আমানতকারীর স্বার্থরক্ষা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি। সেকেন্ড হলো আমরা সার্ভিস মেইনটেইন করছি। সার্ভিসের কোয়ালিটি মেইনটেইন করা এবং সব গ্রাহককে একটি বার্তা দিতে চাই যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজকে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গ্রাহকদের এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে প্রচেষ্টা চলছে সেখানে গ্রাহকদেরই এ ধরনের চিন্তা করার কোনো সুযোগই নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে মার্জারের কথা বলছে এটা শুধু আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষার করার জন্যই বলছে। যাতে আমানতকারীরা কোনো ধরনের প্রবলেম এর মধ্যে না পড়ে এবং প্রবাসীদের জন্য তো অনেক ধরনের সুবিধা এবং প্রত্যেকটি ব্যাংকে স্পেশাল সাবসিডি স্কিম আছে প্রবাসীদের জন্য এবং প্রবাসীদের অর্থ দিয়ে আমাদের দেশের ডেভেলপমেন্টের একটা বড় কাজ হয় এবং আমাদের যে আমদানি-রপ্তানির ঘাটতি আছে সেই ঘাটতিগুলো এখান থেকে পূরণ করি।

সেই জায়গায় প্রবাসীরা সবসময়ই প্রায়োরিটিতে থাকে এবং তাদের আমানতের কোনো ধরনের সমস্যা হবে এরকম কোনো সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার রাখেনি এবং আমি বলছি যে, যে প্যারামিটারগুলো দিয়ে নিশ্চিত হয় যে একটি ব্যাংক সবল নাকি দুর্বল। সেই প্যারামিটারগুলো নিয়ে আমরা সবসময় কাজ করি। আমাদের এই প্যারামিটারগুলো খুব ভালো আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটাই স্ট্যান্ডার্ড আছে অ্যাডভান্স এবং ডিপোজিট রেশিও। সেই অ্যাডভান্স এবং ডিপোজিট রেশিও’র যে প্যারামিটার তার অনেক নিচে আমরা আছি। সেই জায়গায় এবং কার রেশিও যেখানে ক্যাপিটাল রেশিও আছে যেটা ক্যাপিটাল লিকুইডিটি।

এই জায়গাগুলোতে আমরা ১৪ এর ওপরে আছি। তাই গ্রাহকদের সুনির্দিষ্ট বার্তা দিতে চাই, এ ধরনের প্রবলেম আমাদের ব্যাংকে নেই এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুবই সচেষ্ট এ ব্যাপারে যাতে গ্রাহকদের কোনো সমস্যা না হয়।

ইত্তেফাক ডিজিটাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 

পারভেজ তমাল: আপনিসহ ইত্তেফাকের পাঠকদের ধন্যবাদ।

ইত্তেফাক/এবি