মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১৫

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের নাম, ব্যক্তিত্বের প্রভা বিচারালয়ের চার দেওয়ালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রগাঢ় মানবতাবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি। যুদ্ধোত্তর (১৯৪৩) ব্রিটিশ ভারতে মানবতার সেবায় ‘আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম’ সংস্থাটির মাধ্যমে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। দেশভাগের আগে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়েও দাঙ্গা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

 সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ, সংক্ষেপে পরিচিত ছিলেন এস এম মোরশেদ নামে। ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুশির্দাবাদ জেলার সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাতা আফজালুন্ নেছা। শেরেবাংলা এ কে ফজুলল হকের বোন। বাবা সৈয়দ আবু সালিক ছিলেন তত্কালীন বিসিএস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস) কর্মকর্তা। একসময় বগুড়া ও দিনাজপুরের জেলা মেজিস্ট্রেট ছিলেন।

১৯২৬ সালে রাজশাহী বিভাগে সব প্রার্থীর মধ্যে মাহবুব মোরশেদ প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতি শাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ অনার্স পাশ করেন। পর্যায়ক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএএলবি, উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডন যান। সে সময়ে তিনিই একমাত্র ভারতীয় ছাত্র ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ সংকলনের প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন তিনি। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক।

চল্লিশ দশকের প্রথমার্ধে লেখক হিসেবে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের পরিচিতি সর্বত্র ছাড়িয়ে পড়ে। লন্ডনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর ফিলিস্তিন এবং আরব বিশ্বে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। স্টেটসম্যান পত্রিকায় কায়েদে আজম সম্পর্কে সমালোচনাও সে সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে শপথ নেন। এক্ষেত্রে তার বুদ্ধিমত্তা এবং প্রজ্ঞার পরিচয় সর্বজনবিদিত। ১৯৫৪ সালের ২১ দফা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ৬ দফা, যা ২১ দফারই যে সারাংশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উনসত্তরে ছাত্রদের উত্থাপিত ১১ দফা দাবির প্রতিপাদ্যও যে একই সূত্রে গাঁথা, ইতিহাস বিশ্লেষকদের তা-ও দৃষ্টি এড়ায়নি। এসব দাবি প্রণয়নে তার মেধা এবং মননশীলতার কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

 

ছবি: সংগৃহীত

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি গঠনে তিনি তত্কালীন সরকারের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন নির্ভীক সৈনিক। ১৯৬৮ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক তথাকথিত মামলা দায়ের করা হয়। বিচারপতি মোরশেদের প্রতিবাদস্বরূপ প্রধান বিচারপতির পদ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের কাতারে নিজেকে শামিল করেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার কৌঁসুলি হিসেবে প্রখ্যাত আইনবিদ স্যার উইলিয়ামস নিযুক্ত হন। স্যার উইলিয়ামসের সবচেয়ে নিকটতম সহচর ছিলেন বিচারপতি মোরশেদ।

বিচারপতি মোরশেদ তার আসাধারণ পাণ্ডিত্য এবং প্রজ্ঞা-মেধার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে মূল্য দিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে তিনি একদিকে আইয়ুব খানের তথা সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, পাশাপাশি এ দেশবাসীর অকুণ্ঠ সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লাভ করেছিলেন। বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে নির্ভীকতা ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। ফলে রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছিল স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন এবং সব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের মাঝে ফিরে এসে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের মতো প্রজ্ঞাময় আরো অনেক বৃদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদ ব্যক্তিত্বের অবদান রয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামের এই দেশটিকে গড়ার পেছনে। তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তারা জাতির জনক বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতকে শক্তিশালী করেছিলেন। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের বিখ্যাত রায়গুলোর মধ্যে—মাহমুদ মামলা, মন্ত্রী সংঘটিত মামলা ও সমাবর্তন মামলা বিখ্যাত। একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন—‘তিনিই একমাত্র বলিষ্ঠ বিচারক’। প্রখ্যাত আইনবিদ বীরেণ সরকার মন্তব্য করেন, ‘তিনিই একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি আদায়ের ব্যাপারে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। গণতন্ত্রই মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার এই কথা মনে রেখেই তিনি সর্বদা তার ঐতিহাসিক বিচার বিভাগীয় রায় দিয়েছেন।’ হাফিজ ইকবাল, রুমী, জামী, রবীন্দ্র, নজরুল এদের রচনা ছাড়াও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, শেরেবাংলা, হেকিম আজমল খান, শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী—এদের বাণী তিনি সব সময় উদ্ধৃতি দিতেন।

মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার সুচিন্তিত ‘ওয়ান ম্যান, ওয়ান ভোট’ পদ্ধতি আজ সর্বজনস্বীকৃত। এটি সত্তরের নির্বাচনের সময়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ এটি শুধু একটি নাম নয়। ইতিহাসের কিংবদন্তি অবিস্মরণীয় নাম। নতুন প্রজন্মকে তার সম্পর্কে জানার আহ্বান জানাই এ কারণে যে, তাকে জানলে বাংলাদেশের উেসর ইতিহাস জানা যাবে। এই মহান মানুষ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল এই সুন্দর সুশোভিত পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তিনি বেঁচে আছেন হূদয়ে হূদয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

লেখক : কবি ও মহাসচিব, মোরশেদ স্মৃতি সংসদ

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন