মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

চুক্তিভিত্তিক খামার মুরগির উৎপাদন খরচ কমায় ঝুঁকি কমায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের

অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই রোগ প্রতিরোধে কয়েকটি কোম্পানি খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ২০:০৫

জাতীয় ভাবে মুরগির মাংসের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দেশে ক্রমেই ব্রয়লার মুরগির খামার বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে খাত সংশ্লিষ্টরা এখনই যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেছেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট খামারের অনেক খামারি রোগ প্রতিরোধের জন্য সুস্থ মুরগিকেও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার আলোকে এ খাতের স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মুরগিসহ গবাদি পশুর খামারে কেবলমাত্র রোগের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত। কারণ অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জীবাণুকে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধী করে তোলে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া প্রায়ই মানুষের দেহে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায় বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা খামারের জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মুরগির রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুরগির খামারের চারপাশে নিরাপত্তা বেড়া দেওয়া, এবং মুরগির খামারে প্রবেশের আগে জীবাণুনাশক দিয়ে হাত-পা ধোয়া, প্রয়োজন বোধে পরিধেয় কাপড় পরিবর্তন বা তাতেও জীবাণুনাশক স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হলে সাধারণত খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না বলেও জানিয়েছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

বিভিন্ন পর্যায়ের খামারিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছোট খামারের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা পোল্ট্রি কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন, তারা কোম্পানি কর্মকর্তাদের পরামর্শে জৈবনিরাপ্তা মেনে খামার পরিচালনা করেন। ফলে চুক্তিবদ্ধ খামারে মুরগি প্রতি সর্ব সাকুল্যে দেড় থেকে তিন টাকা পর্যন্ত ওষুধ লাগে। পক্ষান্তরে ব্যক্তি পর্যায়ের খামারগুলোতে খামারিরা অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করেন। এতে ওই সব খামারে প্রতি ব্রয়লার মুরগির জন্য ওষুধ বাবদ ১২ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।

রাজধানীর নিকটবর্তী নরসিংদী জেলার শিবপুরের চৈতন্যা গ্রামের তরুণ খামারি ইমরান ভূঁইয়া প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ মুরগির ব্যবসা করেন। কিন্তু ব্রয়লার বিক্রির কত দিন আগে মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো বন্ধ করতে হয় তা তিনি জানেন না। অকপটে ইমরান জানান, ডিলারের পরামর্শ অনুযায়ী ওজন বাড়াতে এবং মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে মুরগি বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত অ্যান্টিবায়েটিকসহ বিভিন্ন প্রকার ওষুধ খাওয়ানো অব্যাহত থাকে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিলাররা খামারিদের কাছে মুরগির ছানা, খাবার ও ওষুধ বিক্রি করেন। ডিলারের কথামত একেক ব্যাচে এক হাজার মুরগির জন্য ১২ থেকে ১৯ হাজার টাকার ওষুধ ব্যবহার করতে হয়েছে উল্লেখ করে তরুণ এই খামারি জানান, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি লাভের আশায় অনেক ডিলার খামারিদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক চাপিয়ে দেন।

শিবপুরের টঙ্গীরটেকের মোহাম্মদ শরীফ (৩০) এক সময় মুদি দোকানী ছিলেন। স্থানীয় ডিলারের ঋণ সহায়তায় তিনি এখন পোল্ট্রি মুরগির খামারি হয়েছেন। গত পহেলা মার্চ ইমরান জানান, "আমি গত ২২ দিনে ওষুধের জন্য ১১,০০০ টাকা খরচ করেছি এবং মুরগি বিক্রির পূর্ব পর্যন্ত বাকী ছয় দিনে এ খরচ ১৫ হাজারে দাঁড়াবে। মুরগি মৃত্যুর ভয়ে আমি অবিরাম ওষুধ ব্যবহারে বাধ্য হই" জানান শরীফ।

স্বামী রাজু মিয়া প্রবাসে থাকায় নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় পোল্ট্রির খামার করেছেন টঙ্গীরটেকের নারী উদ্যোক্তা বিলকিস। তিনি বলেন, "মুরগির মৃত্যু ঠেকাতে উৎপাদন চক্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওষুধ দিতে থাকি। এর পরও ২০০৯ সাল থেকে এ ব্যবসা করে অনেক লোকসান হয়েছে। মাঝে মধ্যে কিছু লাভও হয়েছে।"

চৈতন্যা এলাকার মধ্য বয়সী গৃহবধূ রুশিয়া আক্তার ঋণের টাকায় স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। ঋণের বোঝা কমাতে প্রতিবেশীর করা শেড ভাড়া নিয়ে একটি কোম্পানীর সাথে চুক্তিভিত্তিক খামার পরিচালনা করছেন রুশিয়া। 

প্রসঙ্গত: রুশিয়ার হাস্যোজ্বল জবাব, "কোম্পানীর কথামত জৈব নিরাপত্তার সব নিয়ম মানি, সে কারণে অন্যসব খামারের তুলনায় আমার খামারে রোগবালাই যেমন নাই তেমনি মুরগি মৃত্যুর হারও কম। ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক নয়, ঠান্ডারমত রোগে আদা আর কালিজিরা (কালোজিরা) ব্যবহার করি।"

চৈতন্যার উত্তর পাড়ার নুসরাত জাহান চুক্তিভিত্তিক চার হাজার মুরগির খামার পরিচালনা করেন। টানা চার বছর ডিলারের সাথে ব্যবসার তিক্ত অভিজ্ঞতার পাট চুকিয়ে স্বামী কাওসার মাহমুদের সহায়তায় গত এক বছর ধরে একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি ভিত্তিক খামার চালাচ্ছেন তিনি। ৪ হাজার মুরগি পালন ক্ষমতা সম্পন্ন দ্বি-শেড বিশিষ্ট খামার অদূরে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর উপস্থিতিতে কাওসার জানান, "আমাদের এখন আর টাকা খোয়ানো বা ঋণ গ্রস্ত হওয়ার ভয় নাই। বরং উৎপাদন বেশি হলে কোম্পানি থেকে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়া হয়" বলে জানান কাওসার। তার মতে, ওষুধ বিহীন মুরগি পালনে খামারে সব সময় জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে অধিকতর সচেতন থাকতে হয়। নরসিংদী জেলার পোল্ট্রির খামারীদের কাছে পেশাদার পরামর্শক হিসেবে সুপরিচিত কৃষিবিদ শাহাদৎ হোসেন জানান, চুক্তিভিত্তিক খামার পরিচালনায় সহায়তাকারী কোম্পানি কর্তৃপক্ষ খামারিদের বিজ্ঞান সম্মত জৈবনিরাপত্তা শেখাচ্ছে। কম ওষুধের ব্যবহার আর কম খরচে বেশি উৎপাদন ও স্বাস্থ্য সম্মত মুরগি বাজারজাত করা পর্যন্ত খামারিদের পেছনে কোম্পানির লোকেরা লেগে থাকছেন। তার মতে, অভ্যাস পরিবর্তন করতে সময় লাগছে ঠিকই, তবে এ খাতের অগ্রযাত্রা টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরী হয়ে পড়েছে। 

প্রসঙ্গত: শাহাদাৎ হোসেন জানান, দেশে চুক্তিভিত্তিক মুরগির খামার ব্যবসায় কাজী ফার্মস অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ছোট ছোট খামারিদের চুক্তির আওতায় এনে জৈবনিরাপত্তার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই মুরগির বেশি উৎপাদন প্রক্রিয়া শেখাচ্ছে। কোম্পানি কর্তৃক প্রকাশিত জৈবনিরাপত্তা নির্দেশি- কায় খামারে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানব স্বাস্থ্যের বিরূপ প্রভাবের কথাও বিশেষ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার রোধে সুস্থ প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধের আহবান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সুস্থ পশুর রোগ প্রতিরোধের জন্য খামারিদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধের সুপারিশ করে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি বলেছে, মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের ৮০ শতাংশ কিছু দেশের পশু খামারে ব্যবহার হয়। এর দ্বারা যদি ব্যাকটেরিয়া এই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে তাহলে স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো মানব দেহের সংক্রমণের চিকিৎসা করার সক্ষমতা হারাবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান শিকদার মনে করেন, চুক্তিভিত্তিক খামার পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর প্যানেলে বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নেটওয়ার্ক এবং ব্যবসায়িক মডেল রয়েছে। যা তাদের আওতায় থাকা খামারে জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখার সাথে সাথে ন্যয় সঙ্গত ওষুধের ব্যবহারের জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খামারিদের বেশি উৎপাদন ও উপার্জন সহায়তার সঙ্গে খামারের বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা হয়। "কোম্পানীগুলো খামারিদের জন্য যা করছে তার মাধ্যমে দেশ একসময় পুরোপুরিভাবে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে স্বংয়সম্পূর্ণ হবে-যা একটি জাতীয় অগ্রাধিকারও বটে" -উল্লেখ করেন অধ্যাপক শিকদার।

ইত্তেফাক/এএইচপি